সোমবার একধাক্কায় সংস্থার প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার কথা জানাল মাইক্রোসফট (Microsoft)। সংস্থার মোট ২.১ শতাংশ কর্মী হারাচ্ছেন এই ছাঁটাইয়ের জেরে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে সংস্থার এক্সবক্স (Xbox) বিভাগে। সংস্থার চিফ পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান (Amy Coleman) কর্মীদের কাছে পাঠানো এক মেমোয় জানিয়েছেন, ছাঁটাই হওয়া পদগুলিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence, AI) সরাসরি কাউকে প্রতিস্থাপন করছে না ঠিকই, তবে এআই যে কাজ করার গোটা পদ্ধতিটাই বদলে দিচ্ছে, তা মেনে নিতে দ্বিধা করেননি তিনি।
এক্সবক্সেই সবচেয়ে বড় কোপ
মাইক্রোসফটের গেমিং বিভাগ এক্সবক্সে মোট ৩২০০ কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে, যার মধ্যে ১৬০০ জনকে সরাসরি সোমবারেই ছাঁটাই করা হয়েছে, বাকি ১৬০০ কর্মীকেও ছেড়ে দিতে হবে চলতি অর্থবর্ষ শেষ হওয়ার আগেই। এক্সবক্সের সিইও আশা শর্মা কর্মীদের জানিয়েছেন, গেমিং বিভাগের ইতিহাসে এত বড় সংস্কার আগে হয়নি। গত পাঁচ বছরে এক্সবক্সের পিছনে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার (প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ করেও রাজস্ব কমেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। জনপ্রিয় সাবস্ক্রিপশন পরিষেবা গেম পাসের দুর্বল পারফরম্যান্স এবং ছোট স্বাধীন গেম নির্মাতাদের সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতাকেও এর নেপথ্যে কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। এমনকি কিছু গেমিং স্টুডিও বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি সংস্থা।
কেন এই ছাঁটাই
চলতি বছরের প্রথমার্ধে মাইক্রোসফটের শেয়ারের দর প্রায় ২৩ শতাংশ পড়ে গিয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সংস্থার সবচেয়ে খারাপ পারফরম্যান্স। এর আগে চলতি বছরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০০০ কর্মীকে স্বেচ্ছাবসরের প্রস্তাব দিয়েছিল সংস্থা। প্রতি অর্থবর্ষের শেষে জুন মাসে কর্মী সংখ্যা পুনর্বিন্যাস করার রীতি মাইক্রোসফটের বহু পুরনো। কিন্তু এবারের আসল চাপ এসেছে এআই পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের কারণে। চলতি বছরের জন্য মাইক্রোসফট মূলধনি খরচ ধার্য করেছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি ডলার (প্রায় ১৮ লক্ষ কোটি টাকা), যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। ডেটা সেন্টার তৈরির লক্ষ্যে এই বিপুল খরচ সংস্থার নগদের জোগানে চাপ তৈরি করছে বলেই মত বিশ্লেষকদের।
শুধু মাইক্রোসফট নয়
এই ছাঁটাই বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, বরং প্রযুক্তি দুনিয়ার এক বৃহত্তর ছাঁটাই-ঢেউয়ের সাম্প্রতিকতম সংযোজন মাত্র। মে মাসেই মেটা (Meta) আট হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, বাতিল করে দিয়েছে আরও ছয় হাজার নতুন পদে নিয়োগের পরিকল্পনা। চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত এআই-জনিত কারণে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এক লক্ষ বিয়াল্লিশ হাজারেরও বেশি চাকরি গিয়েছে। তালিকায় নাম রয়েছে ক্লাউডফ্লেয়ার (Cloudflare) এবং পেপ্যালেরও (PayPal)। উলটো দিকে গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও আমাজন মিলিয়ে চলতি বছরে সম্মিলিত মূলধনি খরচ ছুঁতে পারে প্রায় সত্তর হাজার কোটি ডলার (৬৬ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি), যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ কর্মী ছাঁটাই করেও এআই পরিকাঠামোয় লগ্নির অঙ্ক কমাচ্ছে না কোনও সংস্থাই।
ভারতেও পড়ছে আঁচ
এই বিশ্বব্যাপী ছাঁটাই-ঢেউয়ের আঁচ থেকে বাদ যায়নি ভারতও। চলতি বছরের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে এআই-জনিত কারণে যত প্রযুক্তি কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তার ৭ শতাংশেরও বেশি ভারতে, যা আমেরিকার পরেই সর্বোচ্চ। তবে ছবিটা সরলরৈখিক নয়। ভারতে সামগ্রিক ভাবে আইটি ক্ষেত্রে নিয়োগ গত এক বছরে ৩ শতাংশ কমলেও, এআই সংক্রান্ত পদে নিয়োগ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। দেশের বৃহত্তম সফটঅয়্যার রফতানিকারী সংস্থা টিসিএস (TCS) এই অর্থবর্ষে কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে ২৩ হাজারেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোডিং, টেস্টিং কিংবা সহায়তা পরিষেবার মতো একঘেয়ে কাজে এন্ট্রি-লেভেল পদগুলিই এআইয়ের প্রথম নিশানা, ফলে দেশের বহু প্রথাগত আইটি ও বিপিও পদ ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প মহলের হিসেব বলছে, ২০৩১ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় বিশ লক্ষ প্রথাগত আইটি ও বিপিও পদ বিলুপ্ত হতে পারে, যদিও একই সঙ্গে বাড়বে এআই-দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা।
পশ্চিমবঙ্গের প্রযুক্তি শিল্পে কী বার্তা
এই সার্বিক পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজ্যের আইটি শিল্প এখন সম্প্রসারণের পথে হাঁটছে। সল্টলেক সেক্টর ফাইভ এবং নিউটাউন মিলিয়ে রাজ্যে বর্তমানে প্রায় দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ কর্মরত টিসিএস, উইপ্রো, ইনফোসিস, এইচসিএল, কগনিজ্যান্টের মতো সংস্থায়। নিউটাউনে চলছে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি (Bengal Silicon Valley) প্রকল্প, যেখানে ইতিমধ্যেই জমি পেয়েছে চল্লিশটিরও বেশি সংস্থা। শিলিগুড়িতে রাজ্যের নিজস্ব ডেটা সেন্টারে বসেছে এনভিডিয়ার (Nvidia) উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জিপিইউ চিপ, যা এআই প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। কিন্তু প্রতি বছর সদ্য পাশ করা যে তরুণ ইঞ্জিনিয়াররা মাসে কুড়ি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা মাইনের এন্ট্রি-লেভেল কোডিং বা টেস্টিং পদে ঢোকেন, ঠিক এই ধরনের কাজই সবচেয়ে আগে স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে এআইয়ের হাত ধরে। ফলে রাজ্যের আইটি পরিকাঠামো যতই বাড়ুক, সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে তরুণ প্রজন্মকে এখন থেকেই এআই-দক্ষতা রপ্ত করতে হবে, নইলে বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালির চাকরির বাজারেও ঢোকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।




