• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 7 July, 2026

Explained: টানা একমাস ধরে ফুটছে প্রশান্ত মহাসাগর, তার আঁচে কতটা পুড়বে বাংলার আকাশ?

এল নিনোর জেরে টানা একমাস ধরে ফুটছে প্রশান্ত মহাসাগর। সুপার এল নিনোর আশঙ্কা। কেমন প্রভাব পড়বে পশ্চিমবঙ্গের বৃষ্টি ও চাষে, সবিস্তার প্রতিবেদন।

Explained: টানা একমাস ধরে ফুটছে প্রশান্ত মহাসাগর, তার আঁচে কতটা পুড়বে বাংলার আকাশ?

Super El Nino Impact On Bengal (AI)

প্রশান্ত মহাসাগরের (Pacific Ocean) জল রীতিমতো ফুটতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক আবহবিদরা আতঙ্কিত। তাঁদের পর্যবেক্ষণ বলছে, টানা ৩০ দিন ধরে ওই মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী। এই বিরল ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এল নিনো (El Nino), যা ক্রমশ পরিণত হতে চলেছে সুপার এল নিনোতে (Super El Nino)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এই এল নিনো শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তার ধাক্কা এড়াতে পারবে না ভারত। ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বাংলাও।

একমাস ধরে ফুটছে সমুদ্র

মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা নোয়া (NOAA)-র হিসেব বলছে, গত এক মাস ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের নিনো ৩.৪ (Nino 3.4) অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা লাগাতার স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি রয়েছে, যা মরসুমের এই সময়ের রেকর্ড উষ্ণতা। জুন মাসেই নোয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এল নিনো ঘোষণা করে দিয়েছে। নাসার (NASA) স্যাটেলাইট সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেলিখ (Sentinel-6 Michael Freilich)-এর পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে, প্যাসিফিকের পশ্চিম প্রান্ত থেকে উষ্ণ জলের ঢেউ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কেলভিন ওয়েভ (Kelvin wave), পূর্ব দিকে এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ছবি অনেকটা মিলে যাচ্ছে ১৯৯৭ সালের সঙ্গে, যে বছর তৈরি হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো।

সুপার এল নিনো

বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী, নিনো ৩.৪ অঞ্চলে তাপমাত্রার হেরফের দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেই তাকে বলা হয় সুপার এল নিনো (Super El Nino)। ইউরোপীয় আবহাওয়া সংস্থা ইসিএমডব্লিউএফ (ECMWF)-এর পূর্বাভাস, চলতি বছরের নভেম্বরে এই এল নিনো তার শিখরে পৌঁছবে। তখনই বোঝা যাবে তা ১৯৯৭-৯৮ বা ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোকেও ছাপিয়ে যায় কিনা। উদ্বেগের বিষয় হল, এই মুহূর্তে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এমনিতেই রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। এত উষ্ণ পৃথিবীতে এত শক্তিশালী এল নিনো এর আগে কখনও দেখা যায়নি, তাই এর প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন।

বর্ষায় পড়েছে কোপ

ভারত ইতিমধ্যেই এল নিনোর প্রভাব টের পাচ্ছে। খাতা কলমে বর্ষাকাল হলেও বৃষ্টি তেমন হচ্ছে না। জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ১৯০১ সালের পর থেকে এটাই দেশের পঞ্চম সবচেয়ে শুকনো জুন। বৃষ্টির ঘাটতির জেরে চাষের কাজ গত বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (India Meteorological Department, IMD) জুলাই মাসেও দেশের বড় অংশে স্বাভাবিকের থেকে কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। এই অবস্থায় একটি ইতিবাচক ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু (positive Indian Ocean Dipole, IOD) তৈরি হলে এল নিনোর ধাক্কা কিছুটা সামলানো যেত। কিন্তু আইএমডি জানাচ্ছে, দ্বিমেরু এখনও নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে, ফলে সেই স্বস্তির সম্ভাবনাও কম।

পশ্চিমবঙ্গে ছবিটা কেমন

এই সার্বিক ছবির মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের হিসেবটা কিছুটা আলাদা। আবহাওয়া দপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, উত্তরবঙ্গে জুন মাসে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের বেশি। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং জেলায় একের পর এক ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের ছবিটা তার উলটো, বৃষ্টি সেখানে থেকেছে স্বাভাবিকের কম। জুলাইয়ের গোড়ায় ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূল লাগোয়া উত্তর বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে, যার জেরে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে সাময়িক স্বস্তি মিললেও তা বৃষ্টিপাতের বড় ঘাটতি পুরোপুরি মেটাতে পারবে না বলেই মনে করছেন আবহবিদরা। আগামী কয়েক দিনে উত্তরবঙ্গ ও সিকিমে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও দক্ষিণবঙ্গের ধান ও পাটচাষিদের উদ্বেগ এখনই কাটছে না। বৃষ্টি কম হলে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (Damodar Valley Corporation, DVC)-এর জলাধারগুলিতে জলস্তর কমে যাওয়ার শঙ্কাও থাকছে, যার প্রভাব পড়তে পারে সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

ইতিহাস কী বলছে

১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে বিশ্বের ইতিহাসে যে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা গিয়েছিল, তার নেপথ্যেও ছিল সেই সময়ের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো। জার্নাল অফ ক্লাইমেট (Journal of Climate)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এশিয়ার বর্ষানির্ভর এলাকাগুলি সেই সময় ৮০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছিল, যার আঁচ থেকে রেহাই পায়নি ভারতও। বিজ্ঞানীরা এখনই এমন পরিস্থিতিই হবে তা বলছেন না, কিন্তু সতর্ক করছেন। তাঁদের বক্তব্য, একুশ শতকের উষ্ণ পৃথিবীতে এত শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে তার প্রভাব হতে পারে অপ্রত্যাশিত।