বিশ্বকাপে বড়সড় অঘটন, যাকে ঈন্দ্রপতনও বলা যায়। শেষ ষোলোর লড়াই থেকেই বিদায় নিল ব্রাজিল। ভারতীয় সময় অনুযায়ী সোমবার নরওয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ২-১-এ হারিয়ে বিশ্বকাপ থেকে তাদের ছিটকে দিল। নরওয়ের সেরা তারকা এরলিং হালান্ড-ই তাদের ছিটকে দিলেন বলা যায়। এ দিন তিনি একাই দু-দুটি গোল করে ব্রাজিলকে হারিয়ে দেন ও দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন।
১৯৯০-এর পর এই প্রথম বিশ্বকাপের এত তাড়াতাড়ি বিদায় নিতে হল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। অন্যদিকে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে জায়গা করে নিল নরওয়ে। এবার ১১ জুলাই মিয়ামিতে কোয়ার্টার ফাইনালে স্টালে সোলবাকেনের দলের প্রতিপক্ষ হবে ইংল্যান্ড, যারা এ দিন অপর ম্যাচে মেক্সিকোকে ৩-২-এ হারিয়ে দেয়।
যে মাঠে ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের ফাইনাল হওয়ার কথা, সেই নিউ জার্সির মাঠ থেকেই এ দিন বিদায় নিতে হল ব্রাজিলকে। শেষ ষোলোয় ব্রাজিলকে হারিয়ে নরওয়ে এখন ফাইনালে ওঠার থেকে মাত্র দুই ম্যাচ দূরে। সেই জয়ে বড় ভূমিকা নেন এরলিং হালান্ড, যিনি টুর্নামেন্টে তাঁর ষষ্ঠ ও সপ্তম গোল করেন। এই দুই গোলের সুবাদে অ্যাডিডাস গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির সমকক্ষ হয়ে গেলেন। ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে ব্রাজিলকে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে পেনাল্টি থেকে একটি গোল এনে দেন নেইমার, যিনি এ দিন ৬৭ মিনিটের মাথায় পরিবর্ত হিসেবে নামেন।
প্রথমার্ধেও ব্রাজিল একটি পেনাল্টি পেয়েছিল, কিন্তু তা থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন ব্রুনো গিমারেস। ওই গোলটি করলে হয়তো ম্যাচের ছবিটা অন্যরকম হত। কিন্তু নিয়তি যেখানে ঠিক করেই রেখেছিল যে, ব্রাজিল এই ম্যাচ থেকেই বিশ্বকাপে বিদায় নেবে, সেখানে কারও কিছুই করার নেই। দ্বিতীয়ার্ধে ৭৯ ও ৯০ মিনিটে দু’টি অনবদ্য গোল করে ব্রাজিলের স্বপ্ন চুরমার করে দেন হালান্ড।
ম্যাচের পরে সাংবাদিক বৈঠকে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে হালান্ডকে কেন আটকাতে পারলেন না ব্রাজিলের তারকা ফুটবলাররা। ব্রাজিলের হতাশ কোচ কার্লো আনসেলোত্তি বলেন, “হালান্ড কীভাবে খেলে, সেটা সবাই জানে। আমার ডিফেন্ডারদের ওর বিরুদ্ধে কীভাবে খেলতে হবে, সেটা নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই।”
তিনি বলেন, “ওরা অবশ্যই এর আগে বহুবার হালান্ডের মুখোমুখি হয়েছে। তাই আমাদের পুরো মনোযোগ ছিল ম্যাচের জন্য সঠিক প্রস্তুতি নেওয়ার দিকে। প্রতিপক্ষের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা জানতাম এবং এটাও জানতাম যে আক্রমণে তারা অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
দুপুরের উজ্জ্বল রোদে শুরু হওয়া ম্যাচে প্রথমদিকে প্যাট্রিক বের্গের একটি বিপজ্জনক সুযোগ কোনও রকমে সামলে নেয় ব্রাজিল। এরপর প্রথম কোয়ার্টার শেষ হওয়ার আগেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পায় সেলিসাও। মাতেউস কুনহাকে ট্যাকল করতে গিয়ে সময়ের হিসাব ভুল করেন ক্রিস্টোফার আয়ের। ভিএআর পর্যালোচনার পর ব্রাজিলের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি।

প্রথমে নিজেই শট নেবেন বলে ঠিক করেছিলেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। পরে তিনি সেটি তুলে দেন ব্রুনো গিমারায়েসের হাতে। কিন্তু গিমারায়েসের নেওয়া শট বাঁ দিকের নিচু কোণে ঝাঁপিয়ে পড়ে দৃঢ় হাতে প্রতিহত করেন নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড।
কেন গিমারেসকেই পেনাল্টি মারার দায়িত্ব দেওয়া হল, এই প্রশ্নের উত্তরে আনসেলোত্তি বলেন, “আমরা ব্রুনোকেই বেছে নিয়েছিলাম, কারণ আমাদের মনে হয়েছে মাঠে সেই-ই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। পেনাল্টির জন্য প্রথম দুই বাছাই মাঠে ছিল না বলেই এই সিদ্ধান্ত নিই।”
৩৫ বছর বয়সি নরওয়ের গোলরক্ষক নিল্যান্ড ছোটবেলায় হ্যান্ডবল খেলতেন। তবে এদিন তাঁর হাতের পাশাপাশি পায়ের দুর্দান্ত সেভও নজর কাড়ে। প্রথমে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি এবং পরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন তিনি। ফলে বিরতিতে যায় দুই দলই গোলশূন্য অবস্থায়।
নরওয়ের অন্যতম আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আন্তোনিও নুসাকে বিরতির সময় তুলে নেওয়া হয়। তবে গোলের সবচেয়ে বড় সুযোগ নষ্ট করেন ব্রাজিলের বদলি খেলোয়াড় এন্দ্রিক। মাঠে নামার মাত্র ৫২ সেকেন্ড পরেই ভিনিসিয়াস জুনিয়রের নিখুঁত থ্রু-তে একেবারে গোলমুখে পৌঁছে যান এই তরুণ ফরোয়ার্ড। কিন্তু প্রথম টাচটি ভারী হয়ে যাওয়ায় তাঁর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ভোলদার ভাইকিং নামে পরিচিত নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড এরপরও আরও দু’টি অসাধারণ সেভ করেন। প্রথমে রায়ান এবং পরে ব্রুনো গিমারায়েসের শট রুখে দেন তিনি। আর তারপরই আঘাত হানে নরওয়ে।
বিরতির পর আন্তোনিও নুসার বদলি হিসেবে নামা আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ টানা সাতটি নিখুঁত পাসের মুভের পর বাঁ দিক দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে আসেন এবং তিনি বক্সের মধ্যে নিখুঁত একটি ক্রস বাড়িয়ে দেন, যা থেকে এরলিং হালান্ড শক্তিশালী হেডে বল মাটিতে বাউন্স করিয়ে ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসনের নাগালের বাইরে জালে জড়িয়ে দেন।
নির্ধারিত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে নিজের দ্বিতীয় গোলটিও করে ফেলেন হালান্ড। ডানিলোর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে নেওয়া তাঁর শট ঝাঁপিয়ে পড়া অ্যালিসনকে পরাস্ত করে জালে জড়ায়। সেই গোলের পর গ্যালারিতে উপস্থিত অসংখ্য নরওয়ে সমর্থকের উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়াম। অতিরিক্ত সময়ের দশম মিনিটে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও তা ব্রাজিলের জন্য সান্ত্বনাসূচক গোল ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
পেনাল্টির ঠিক আগে নেইমার ও নিল্যান্ডের মধ্যে বেশ খানিকটা কথা কাটাকাটি হয়। তবে তাতে উত্তেজনা বাড়েনি। শেষ বাঁশি বাজার পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন নরওয়ে সমর্থকেরা। তাঁদের সামনে ভাইকিং ওয়েভ-ও করেন দলের ফুটবলাররা। এ বার দেখার কোয়ার্টার ফাইনালের পরেও তারা এই একই রকম উচ্ছ্বাস দেখাতে পারেন কি না।




