তারাতলার নির্মাণস্থলে দুর্ঘটনার পর রাজ্যের নির্মাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করতে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে নির্মীয়মাণ বহুতলগুলির নিরাপত্তা, অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নির্মাণ সংক্রান্ত অনিয়ম এবং ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা— সবকিছুই নতুন করে খতিয়ে দেখা হবে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের বার্তাও দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, তারাতলায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। এনডিআরএফ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথা হয়েছে বলেও তিনি জানান। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রবিবার রাতের মধ্যেই উদ্ধার অভিযান সম্পূর্ণ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। ইতিমধ্যেই উদ্ধার অভিযানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সফলভাবে শেষ হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
সাম্প্রতিক সময়ে গার্ডেনরিচ, কসবা, তিলজলা এবং তারাতলার মতো একাধিক নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার ৩১ জুলাই পর্যন্ত বিশেষ স্ট্রাকচারাল অডিটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজেশ পাণ্ডের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটিকে। সেই কমিটিতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আধিকারিকদের পাশাপাশি রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকনমিক সার্ভিস এবং ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান খড়গপুরের বিশেষজ্ঞদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা যায়।
প্রথম পর্যায়ে কলকাতা, বিধাননগরের রাজারহাট-নিউটাউন ও এনকেডিএ এলাকা, পূজালী, বারুইপুর, বজবজ, মহেশতলা এবং রাজপুর-সোনারপুরের নির্মীয়মাণ প্রকল্পগুলিতে অডিট শুরু হবে। পাশাপাশি দক্ষিণ দমদম, বরানগর, কামারহাটি এবং হাওড়ার গঙ্গা সংলগ্ন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণস্থলও এই বিশেষ পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। তবে রেল, মেট্রো, বন্দর, জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক এবং কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের চলমান পরিকাঠামো প্রকল্পগুলি এই অডিটের বাইরে থাকবে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, ৩১ জুলাই পর্যন্ত সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে— এমন ধারণা ঠিক নয়। যে প্রকল্প বা ওয়ার্ডে অডিট শেষ হবে এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র মিলবে, সেখানে ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে কোথাও গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি বা নিয়মভঙ্গ ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাতিল করা হতে পারে। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের নির্দেশও দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, একই কমিটিকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে শহরের বহুতল আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবনগুলিতে অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বজ্রনিরোধক ব্যবস্থার পৃথক অডিট করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভূমিতলসহ পাঁচতলা বা তার বেশি আবাসিক ভবনকে উচ্চ ভবন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে সাধারণ সংস্কার, বাড়ির রং করা, ছোটখাটো সম্প্রসারণ বা মেরামতির কাজ এই নির্দেশিকার আওতার বাইরে থাকবে। এ বিষয়ে কোনও বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য সকলের প্রতি আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তারাতলা দুর্ঘটনার তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতিমধ্যেই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের অপরাধ দমন শাখা পুরো ঘটনার তদন্ত করছে। প্রাথমিক তদন্তে যাঁদের গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে, সেই স্থপতি ও নকশা প্রস্তুতকারীদের কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বা তদারকিতে অবহেলা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন।
এছাড়া যাঁরা নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদন, লাইসেন্স বা অন্যান্য বিষয়ে প্রতারণা কিংবা ঘুষের শিকার হয়েছেন, তাঁদের স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি উদ্ধারকাজ চলাকালীন নির্মাণস্থলের শ্রমিকদের মানবিক দিক বিবেচনা করে বড় নির্মাণ সংস্থাগুলিকে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আবেদনও জানান তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দুর্গাপূজার আগেই নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল নগরায়নের লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই বিশেষ উদ্যোগের দৃশ্যমান ফল মিলবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।




