• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 5 July, 2026

প্রকৃতির সামনে মানুষের পরীক্ষা : দুর্যোগ আসার আগেই প্রস্তুতির পাঠ

জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। আবহাওয়া ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন-নতুন সংক্রামক রোগের আশঙ্কা।

প্রকৃতির সামনে মানুষের পরীক্ষা : দুর্যোগ আসার আগেই প্রস্তুতির পাঠ

Photo: Magnific

মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। মানুষ নিজের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গর্ববোধ করে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ নিয়ে অহংকার করে। মহাকাশে উপগ্রহ পাঠিয়ে ভাবে পৃথিবীকে বুঝি সে নিজের মুঠোর ভেতর বন্দি করে ফেলেছে। আজ সে সমুদ্রের হাজার মিটার নিচে নেমে যেতে পারে। পাহাড়ের চূড়া কেটে রাস্তা বানাতে পারে। মরুভূমির বুকেও আধুনিক শহর গড়ে তুলতে পারে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস মানুষকে প্রতিদিন নতুন নতুন আবিষ্কারের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে এক নির্মম সত্য— প্রকৃতি যখন নিজের শক্তির প্রকাশ ঘটায়, তখন মানুষের সমস্ত অর্জন মুহূর্তের মধ্যে তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন বোঝা যায়, মানুষ যত বড় সভ্যতাই নির্মাণ করুক না কেন, প্রকৃতির সামনে সে এখনও এক অসহায় শিশু মাত্র।

একটা ভূমিকম্প হয়তো স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই কখনও-কখনও কয়েক লক্ষ মানুষের বহু বছরের সঞ্চিত স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। একটা ঘূর্ণিঝড় যখন উপকূলে আছড়ে পড়ে, তখন শুধু ঘরবাড়ি উড়ে যায় না— উড়ে যায় মানুষের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। বন্যার জল যখন গ্রামের পর গ্রাম গ্রাস করে, তখন তার সঙ্গে ভেসে যায় কৃষকের বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা জীবিকা। প্রকৃতির এই নির্মমতার নাম আমরা দিয়েছি দুর্যোগ। কিন্তু দুর্যোগ শব্দটির ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও বড় এক সত্য— সভ্যতার ভঙ্গুরতা।

আজ পৃথিবী এমন এক সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে যখন প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনকার বাস্তবতা। পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। জলবায়ুর চরিত্র বদলে যাচ্ছে। যেখানে একসময় নিয়মিত বৃষ্টি হতো, সেখানে দীর্ঘ খরা দেখা দিচ্ছে। আবার যেসব অঞ্চল তুলনামূলক ভাবে শান্ত ছিল, সেখানেও হঠাৎ অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা ভূমিধস মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন— আগামী শতাব্দীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে প্রকৃতির অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে।

এই প্রসঙ্গে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি দেশকে বারবার মনে পড়ে— জাপান। দেশটি যেন দুর্যোগের মধ্যেই বেঁচে থাকার শিক্ষা নিয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপরাষ্ট্র, নিয়মিত সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত— তবু জাপানকে কখনও ভেঙে পড়তে দেখা যায় না। কারণ তারা একটি জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝেছে— দুর্যোগকে থামানো যায় না, কিন্তু দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেওয়া যায়। আর সেই প্রস্তুতিই জীবন ও মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করে। জাপানের স্কুলে ছোট-ছোট শিশুদের শেখানো হয় ভূমিকম্প হলে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। বড়-বড় বহুতল ভবন তৈরি হয় এমন প্রযুক্তিতে যাতে প্রবল কম্পনেও ক্ষতি কম হয়। সরকারি প্রশাসন নিয়মিত মহড়া চালায়। প্রযুক্তির সাহায্যে কয়েক সেকেন্ড আগেই সতর্কবার্তা পৌঁছে যায় মানুষের মোবাইলে। পরিকল্পনা আগে তৈরি থাকে, উদ্ধার ব্যবস্থা আগে থেকে প্রস্তুত থাকে। পৃথিবী জাপানের এই সুসংগঠিত প্রস্তুতিকে আজ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এক আদর্শ হিসেবে দেখে।
আমাদের দেশের দিকে তাকালেও বোঝা যায় পরিস্থিতি মোটেই আশ্বস্ত করার মতো নয়। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান নিজেই বহু বিপদের সম্ভাবনা বহন করে। দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে হিমালয়ান রিজিওন, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, গুজরাত এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। হিমালয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে সামান্য বৃষ্টিতেই ভূমিধস নামছে। নদীমাতৃক বিস্তীর্ণ সমতলভূমিতে প্রতি বছর বন্যা যেন নিয়মিত অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের পশ্চিমাঞ্চল ও উপদ্বীপীয় অঞ্চলের বহু এলাকা বছরের পর বছর খরার কবলে পড়ে। কৃষক আকাশের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন বৃষ্টির জন্য, কিন্তু কখনও সেই বৃষ্টি আসে না। আবার কখনও এমন বৃষ্টি নামে যে ফসলের মাঠ ডুবে যায়। বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় রাজ্যগুলির জন্য প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড় এক আতঙ্কের নাম। এক একটি ঘূর্ণিঝড় শুধু গাছ বা ঘর ভাঙে না, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়।

কিন্তু প্রকৃতির এই আঘাত সব মানুষের উপর সমানভাবে পড়ে না। যে মানুষটির ব্যাঙ্কে কোটি টাকা আছে, দুর্যোগ তাঁকে সাময়িক অসুবিধায় ফেলতে পারে। কিন্তু যে দিনমজুর প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালান, একটি বন্যা বা একটি ঝড় তাঁর জীবনের সমস্ত হিসাব ওলটপালট করে দেয়। সমাজের দরিদ্র মানুষ, শ্রমজীবী পরিবার, বৃদ্ধ নাগরিক, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী মানুষ— দুর্যোগের সময় এঁদের বিপদ সবচেয়ে বেশি। কারণ তাঁদের কাছে বিকল্প খুব কম। প্রকৃতি যখন আঘাত করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই মানুষগুলি, যাঁদের জীবন আগে থেকেই অনিশ্চয়তার উপর দাঁড়িয়ে ছিল।

কিছু বছর আগে পৃথিবী এক নতুন ধরনের দুর্যোগ দেখেছে। অদৃশ্য এক ভাইরাস গোটা মানবসভ্যতাকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল। কোভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছিল, দুর্যোগ সবসময় মাটির নিচে বা আকাশের মধ্যে জন্মায় না। কখনও একটি অণুজীবও পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকেও অসহায় করে দিতে পারে। লক্ষ-লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অর্থনীতি থমকে গেছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উন্নয়ন— সবকিছু হঠাৎ যেন অচল হয়ে পড়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে শিখিয়েছে— দুর্যোগ মোকাবিলা কোনও আনুষ্ঠানিক সরকারি কাজ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শুধুমাত্র দুর্যোগ আসার পর ত্রাণ বিতরণ করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। প্রয়োজন আগাম পরিকল্পনা। প্রয়োজন শক্তিশালী পূর্বাভাস ব্যবস্থা। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল। সর্বোপরি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতন নাগরিক সমাজ।

ভারতে বহু বছর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলেও আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। আগামী দিনে হয়তো আরও জটিল দুর্যোগ অপেক্ষা করছে। জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। আবহাওয়া ক্রমশ অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন-নতুন সংক্রামক রোগের আশঙ্কা। সভ্যতার ইতিহাস বলছে, যে সমাজ বিপদের আগেই প্রস্তুতি নেয়, ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার হাতেই থাকে এবং যে সমাজ আত্মতুষ্টিতে ভোগে, প্রকৃতি তাকে ক্ষমা করে না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল উঁচু সেতু, চকচকে শহর কিংবা দ্রুতগামী অর্থনীতি নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে— বিপদের মুহূর্তে মানুষকে রক্ষা করার ক্ষমতা অর্জন করা।

আমরা প্রায়ই ভাবি দুর্যোগ একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা। আসলে দুর্যোগ কখনও হঠাৎ আসে না; আমাদের প্রস্তুতির অভাবই তাকে ভয়ঙ্কর করে তোলে। প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে। ঝড় আসবে, ভূমিকম্প হবে, নদী উপচে পড়বে, নতুন রোগ জন্ম নেবে। প্রশ্ন একটাই— আমরা কি প্রস্তুত?

কারণ ইতিহাস বারবার বলে দিয়েছে, প্রকৃতি কারও জন্য অপেক্ষা করে না। তার অভিঘাতের সামনে টিকে থাকতে হলে আমাদের শিখতে হবে— বিপদ এসে দরজায় কড়া নাড়ার আগে প্রস্তুতির
দরজা খুলে দিতে।