নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে একের পর এক নথি জমা দিয়েও শেষরক্ষা হল না আসামের এক দিনমজুরের। গুয়াহাটি হাইকোর্ট (Gauhati High Court) এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়ে দিয়েছে, ১৫টি পৃথক নথি জমা দিয়েও নিজেকে ভারতীয় নাগরিক বলে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন আমিনুল হক নামে ওই ব্যক্তি। রায়ের জেরে আসামের নাগরিকপঞ্জি সংক্রান্ত মামলাগুলিতে নথির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যেমন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision) বিতর্কের প্রেক্ষিতেও এই রায়ের তাৎপর্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কী ঘটেছে আদালতে
বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামিমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চ গত ৩০ জুন নাগরিকত্ব সংক্রান্ত এই রায়টি দেয়। মামলাটি হল, আমিনুল হক বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড আদার্স, নথিভুক্ত সংখ্যা ডব্লিউপি(সি)/৫৪৭১/২০১৯। ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কামরূপের একটি ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল (Foreigners Tribunal) আমিনুলকে বিদেশি বলে ঘোষণা করেছিল। সেই রায়কেই চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন তিনি, অভিযোগ ছিল ট্রাইব্যুনাল যথাযথ তদন্ত ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের রায়ই বহাল রাখে। গুয়াহাটি হাইকোর্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ওই আদেশ বহাল রেখে জানিয়েছে, ফরেনার্স আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন আমিনুল, যদিও তিনি ১৫টি নথি হাজির করেছিলেন।
আমিনুলের বয়স ৩৮ বছর, পেশায় দিনমজুর, গুয়াহাটিতে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। তাঁর জন্ম ১৯৮৮ সালে। নদীভাঙনের কারণে বারবার ঘরবদল করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকে, চরাই খাসারা থেকে ধোবাকুরা, সেখান থেকে ঘুঘুডোবা এবং শেষে হাসডোবায় গিয়ে থিতু হয় পরিবারটি।
কোন কোন নথি খারিজ হল, কেন
আদালতে আমিনুল যে নথিগুলি জমা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে ছিল ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (National Register of Citizens) ডিজিটাল প্রতিলিপি, যেখানে তাঁর বাবা ও ঠাকুরদার নাম রয়েছে, ১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকার নথি, ১৯৭৩ সালের একটি জমি কেনার দলিল, ২০১৭ সালের স্কুল সার্টিফিকেট, প্যান কার্ড এবং ভোটার পরিচয়পত্র বা এপিক (EPIC)। এ ছাড়া তাঁর বাবা আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে তাঁকে নিজের ছেলে বলে সাক্ষ্যও দিয়েছিলেন।
কিন্তু আদালত একে একে সব নথিতেই ফাঁক খুঁজে পায়। ১৯৫১ সালের এনআরসি নথিটিকে আদালত নিছক কম্পিউটারে তৈরি একটুকরো বিবৃতি বলে চিহ্নিত করে, যাতে ছবির আইডি এবং একটি সফটওয়্যার সংস্করণের উল্লেখ ছিল। এই নথি আইন অনুযায়ী যথাযথ ভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে জানায় আদালত, কারণ তথ্যপ্রমাণ আইনের ৬৫বি ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট ছিল না। জনগণনা আইনের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রমাণে এনআরসি নথির ব্যবহারও যে গ্রহণযোগ্য নয়, তা স্পষ্ট করে দেয় আদালত।
জমির দলিল নিয়েও একই সমস্যা। আদালত জানায়, ওই দলিলে শুধু এটুকুই প্রমাণিত হয় যে আমিনুলের ঠাকুরদা জমি কিনেছিলেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমিনুলের সম্পর্ক তা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্যান কার্ড এবং এপিকের ক্ষেত্রেও আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই দু’টি নথি সরকারি সহায়ক সংস্থার তরফে ইস্যু করা পরিচয়পত্র মাত্র, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। স্কুল সার্টিফিকেট নিয়েও আদালতের বক্তব্য, যে প্রধানশিক্ষক সার্টিফিকেট ইস্যু করেছিলেন তাঁকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়নি, স্কুলের ভর্তির রেজিস্টারও পেশ করা হয়নি। বাবার মৌখিক সাক্ষ্য প্রসঙ্গে আদালতের যুক্তি, প্রামাণ্য নথির সমর্থন ছাড়া শুধু মৌখিক সাক্ষ্যে বংশপরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয় না।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, আদালত এটাও লক্ষ করে যে আমিনুলের ঠাকুরদার নাম বিভিন্ন নথিতে চারটি ভিন্ন বানানে লেখা রয়েছে, আর তাঁর পরিবারের নাম ধোবাকুরা, ঘুঘুডোবা ও হাসডোবা, এই তিন গ্রামের ভোটার তালিকায় অসংলগ্ন ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। বানান বিভ্রাট নদীভাঙনজনিত স্থানান্তরের কারণেই হয়েছে বলে সাফাই দিয়েছিলেন আমিনুল, কিন্তু আদালত তাতে সন্তুষ্ট হয়নি।
কেন এত কঠোর এই আইন
গোটা মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ফরেনার্স আইন, ১৯৪৬-এর (Foreigners Act, 1946) নবম ধারা, যা ঔপনিবেশিক আমলের আইন হলেও আজও আসামে নাগরিকত্ব নির্ধারণের প্রধান হাতিয়ার। এই ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার দায়িত্ব সব সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির উপরেই বর্তায়, রাষ্ট্রের উপর নয় এবং এই দায় কখনও রাষ্ট্রের দিকে সরে যায় না। এই ধারায় এমন একটি ব্যতিক্রমী বিষয় রয়েছে যাতে সাধারণ তথ্যপ্রমাণ আইনের নিয়মও প্রযোজ্য হয় না। ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলায় সাধারণত রাষ্ট্রকে আগে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ দিতে হয়, তার পরেই দায় সরে যায় অভিযুক্তের দিকে। কিন্তু ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে গোড়া থেকেই গোটা দায় ব্যক্তির উপর। মামলায় আমিনুলের হয়ে সওয়াল করেন আইনজীবী এমইউ মাহমুদ, কেন্দ্রের হয়ে সরকারি কৌঁসুলি বি দেকা, নির্বাচন কমিশনের হয়ে এআই আলি এবং অসম সরকার ও এনআরসি কর্তৃপক্ষের হয়ে জে পায়েং।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রায়
এই রায়ের তাৎপর্য শুধু আসামেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গেও সদ্যসমাপ্ত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় ঠিক এই ধরনের প্রশ্নই এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারের তালিকা থেকে নব্বই লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়েছিল প্রাথমিক পর্যায়ে, যার একটা বড় অংশ পরে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে যাচাইয়ের (adjudication) মধ্য দিয়ে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলাতেও এসআইআরের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের পৃথক তালিকা প্রকাশ করতে হয়েছিল প্রশাসনকে।
এই প্রেক্ষাপটে গুয়াহাটি হাইকোর্টের এই রায় ইঙ্গিতবাহী, কারণ এতে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে এনআরসি নথি, প্যান কার্ড কিংবা ভোটার পরিচয়পত্রের মতো সাধারণ পরিচয়পত্র নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট বলে গণ্য হচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত জেলাগুলিতে যেখানে বহু পরিবারের নথিপত্রে সামান্য বানান বিভ্রাট বা প্রজন্মান্তরে ঠিকানা বদল রয়েছে, সেখানে অনুরূপ কড়াকড়ির আশঙ্কা আগামী দিনে আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ঠিক কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।




