রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে নতুন গতি আনতে একের পর এক বড় বিনিয়োগের উদ্যোগ নিচ্ছে রাজ্য সরকার। নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকার দুটি নতুন শিল্প প্রকল্পের ঘোষণা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজ্যে একটি সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন প্রকল্প স্থাপনের বিষয়েও সরকার ইতিবাচক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাও উপস্থিত ছিলেন। নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা শুনে তিনিও উৎসাহ প্রকাশ করেন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই শিল্পমহলের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই নিউটাউনে আদানি হেল্থ সিটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। এর পাশাপাশি আরও কয়েকটি বৃহৎ শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেও সরকার দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
শুভেন্দু অধিকারী জানান, রাজ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি বৃহৎ হোসিয়ারি শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই শিল্পটি শ্রমনির্ভর হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকারের আশা। পাশাপাশি প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি আধুনিক ইস্পাত কারখানা স্থাপনের উদ্যোগও শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই দুই প্রকল্প মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, শুধু এই দুটি প্রকল্পেই সরকার সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। চলতি বছরের মধ্যেই আরও একাধিক শিল্প বিনিয়োগের প্রস্তাব রাজ্যে আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। সেই উদ্দেশ্যে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়ের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার একটি বিশেষ উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিই নতুন শিল্প নীতির খসড়া তৈরি করছে। সরকারের লক্ষ্য, বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ, দ্রুত এবং শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।
সূত্রের খবর, আগামী সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন সরকারের প্রথম শিল্প সম্মেলনের আয়োজন করা হতে পারে। সেই সম্মেলনেই রাজ্যের নতুন শিল্প নীতি প্রকাশ করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। সরকারের আশা, নতুন নীতির মাধ্যমে দেশ-বিদেশের শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করা যাবে।
আলোচনায় টাটা গোষ্ঠীর সম্ভাব্য সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্প নিয়েও মুখ খুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে টাটা গোষ্ঠী আসামে প্রায় ২৭,১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি অত্যাধুনিক সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও পরীক্ষাকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলছে। সেই ধরনের একটি প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গেও আনার চেষ্টা করছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা হবে এবং পশ্চিমবঙ্গে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্রের পাশাপাশি একটি আধুনিক তথ্যভান্ডার কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হবে।
এদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নে সিঙ্গুর প্রসঙ্গও উঠে আসে। তার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প স্থাপনের বিষয়ে কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে বলেই সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। যদিও সিঙ্গুরেই টাটা গোষ্ঠীকে জমি দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকার সম্ভাব্য সব বিকল্প দিক খতিয়ে দেখছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আদানি হেল্থ সিটি প্রকল্পের পর হোসিয়ারি, ইস্পাত এবং সম্ভাব্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নিয়ে সরকারের সক্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের নতুন বার্তা দিচ্ছে। সরকার যদি ঘোষিত পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে আগামী কয়েক বছরে রাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল শিল্পের সম্প্রসারণে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।




