রাজ্য রাজনীতির চড়তে থাকা পারদ এবার সরাসরি পৌঁছল কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) চৌকাঠে। নদিয়ার কালীগঞ্জে (Kaliganj) প্রকাশ্যে হেনস্থা ও ডিম ছোঁড়ার ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিজের আইনি সুরক্ষার আর্জি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন কৃষ্ণনগরের (Krishnanagar) তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) সাংসদ মহুয়া মৈত্র (Mahua Moitra)। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন পাশে না দাঁড়ালে তিনি যে নিজেই আদালতের কড়া নাড়বেন, সেই হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ। অবশেষে নিজের সেই অবস্থানেই অনড় থেকে আইনি পদক্ষেপ করলেন তিনি।
কালীগঞ্জের সেই চার ঘণ্টা: ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনার সূত্রপাত গত ১ জুলাই। নদিয়ার কালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত পলাশীতে (Palashi) একটি সাংগঠনিক বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছিলেন মহুয়া। অভিযোগ, বৈঠক চলাকালীন আচমকাই একদল উত্তেজিত বিক্ষোভকারী ওই বাড়ির সামনে রাস্তায় জড়ো হয়ে ‘গো ব্যাক’ (Go Back) স্লোগান দিতে শুরু করে। সাংসদকে লক্ষ্য করে কুরুচিকর মন্তব্যের পাশাপাশি বাড়িটি তাক করে দেদার ডিম, পচা বেগুন ও কাদা ছোঁড়া হয় বলে দাবি।
পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো হয়ে ওঠে যে, প্রায় চার ঘণ্টা ওই বাড়ির ভিতরেই কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হয় তৃণমূল সাংসদকে। উল্লেখ্য, গোটা ঘটনার ভিডিও নিজেই সমাজমাধ্যমে (Social Media) সরাসরি সম্প্রচার (Live stream) করেন মহুয়া। একই সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখে মোট ১৬ জন অভিযুক্তের নাম প্রকাশ্যে এনে দাবি করেন, হামলাকারীরা প্রত্যেকেই শাসক দল বিজেপির (BJP) সক্রিয় কর্মী।
Hello @IPUparliament
please watch how police in Indian state of Bengal watch complicit as PM Modi’s ruling BJP goons in a lynch mob attack my premises & keep me confined for 4 hours. No protection for Opposition MP from @loksabhaspeaker pic.twitter.com/0d5NsGboCM— Mahua Moitra (@MahuaMoitra) July 2, 2026
হাইকোর্টের কড়া নির্দেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঝামেলা
কাকতালীয় বিষয় হল, কালিগঞ্জের এই অনভিপ্রেত ঘটনার ঠিক একদিন আগেই, অর্থাৎ ৩০ জুন, কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী (Tapabrata Chakraborty) এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের (Partha Sarathi Chatterjee) ডিভিশন বেঞ্চ একটি জনস্বার্থ মামলার (PIL) শুনানিতে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছিল। আদালত স্পষ্ট জানায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা কোনও অভিযুক্তের দিকে ডিম ছোঁড়ার মতো ঘটনা ঘটলে অবিলম্বে এফআইআর (FIR) রুজু করতে হবে। সারা রাজ্যে এই নির্দেশিকা কার্যকর করার জন্য রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে (DGP) সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরিরও নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, রাষ্ট্র যখন কাউকে নিজের হেফাজতে নেয় বা কোনও নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে, তখন তাঁর জীবন ও সম্মান রক্ষা করাও রাষ্ট্রেরই প্রাথমিক কর্তব্য।
আইনজ্ঞদের একাংশের মতে, আদালতের সেই রায়ের রেশ না কাটতেই খোদ একজন হাই-প্রোফাইল বিরোধী মহিলা সাংসদ যেভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় হেনস্থার শিকার হলেন, তা আদালতের ওই গাইডলাইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
“আদালত স্পষ্ট জানায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা কোনও অভিযুক্তের দিকে ডিম ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটলে অবিলম্বে এফআইআর (FIR) রুজু করতে হবে।”
সুর চড়াচ্ছে দুই পক্ষই
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যথারীতি রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। তৃণমূলকে খোঁচা দিয়ে রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh) মন্তব্য করেছেন, বোমার বদলে ডিম ছোঁড়া হয়েছে, এ তো অনেক ভালো লক্ষণ। অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) এই হামলার দায় সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই। হামলাকারীরা আসলে তৃণমূলেরই। এটি অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকোন্দলের (Inner-party feud) ফল।
যদিও মহুয়া মৈত্র এই যুক্তি উড়িয়ে দিয়ে পাল্টা দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারীদের হাতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে বিজেপির দলীয় পতাকা। উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৩ জুন কৃষ্ণনগর জেলা আদালত চত্বরেও বিজেপি মহিলা মোর্চার কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোঁড়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।
আন্তর্জাতিক মঞ্চেও সরব কৃষ্ণনগরের সাংসদ
কালীগঞ্জের ঘটনাকে শুধুমাত্র রাজ্য বা দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, আন্তর্জাতিক স্তরেও সোচ্চার হয়েছেন মহুয়া। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’, ‘গার্ডিয়ান’, ‘লা মঁদ’, ‘বিবিসি’, ‘আল জাজিরা’ এবং ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’-এর মতো বিশ্বের প্রথম সারির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে (International Media) ট্যাগ করে তিনি ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের শাসক দলের মদতেই এক বিরোধী সাংসদকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হল, অথচ রাজ্য পুলিশ সেখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংসদীয় ইউনিয়নকেও (Inter-Parliamentary Union) এই বিষয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। মহুয়ার অভিযোগ, দেশের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Om Birla) কাছ থেকেও কোনও আশানুরূপ নিরাপত্তা বা সহযোগিতা তিনি পাননি।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে (Assembly Election) রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই বিদায়ী শাসক দলের একাধিক প্রথম সারির নেতা-নেত্রীদের উপর এই ধরনের চড়াও হওয়ার প্রবণতা উত্তরোত্তর বাড়ছে। প্রাক্তন মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস, কুণাল ঘোষ, বিজয় সিংহ, জয়প্রকাশ মজুমদার কিংবা সব্যসাচী দত্তের মতো নেতারাও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) সোনারপুরে প্রবল জনরোষের মুখে পড়েন।
এই আবহে মহুয়া মৈত্রের আইনের দ্বারস্থ হওয়ার পর আদালত যদি কোনও নির্দেশ দেয়, বদলের বাংলায় তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হবে বলেই মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।




