শুক্রবার চিন ও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলির মধ্যে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কাঠামো ঘোষণা করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বেইজিং যখন তার অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রভাব বাড়াচ্ছে, তখন নয়াদিল্লি এই বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
শুক্রবার বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের সঙ্গে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের বৈঠকের শেষে যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়, তাতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামুদ্রিক বিষয়, পরিকাঠামো, বহুপাক্ষিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে বিস্তৃত কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিকভাবে এটি এমন একটি চিত্র তুলে ধরে যেখানে বাংলাদেশ তার কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বহুমুখী করতে চাইছে, আর চীন নিজেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির মধ্যে একটি হল ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা—যেখানে দুই দেশের বিদেশমন্ত্রীদের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা একসঙ্গে আলোচনা করবেন। সাধারণত এই ধরনের কাঠামো সেই সব সম্পর্কেই গড়ে ওঠে, যেখানে কৌশলগত ও নিরাপত্তার গুরুত্ব বেশি।
যৌথ বিবৃতিতে সামরিক জোটের ইঙ্গিত নেই, তবে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিনিময়, সফর এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হল, যখন গত ১৮ মাস ধরে পূর্ববর্তী ইউনূস সরকারের আমলে ভারত-বিরোধী অবস্থান দেখা গিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে তা স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লির দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কারণ, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই নিজের প্রতিবেশে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রাধান্য বজায় রাখতে চেয়েছে।
প্রাক্তন মেজর জেনারেল অলোক দেব বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি স্পষ্ট চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে এই যৌথ বিবৃতি মূলত একটি ইঙ্গিত, চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বিস্তারিত জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার আমলেও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু সেগুলির বর্তমান অবস্থা এখনও স্পষ্ট নয়।
কূটনৈতিক দিক থেকেও এই সম্পর্ক তাৎপর্যপূর্ণ। চিন স্পষ্টভাবে সমর্থন জানিয়েছে যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বড় ভূমিকা নিক—বিশেষ করে ব্রিকস-এ যোগদান এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার প্রচেষ্টায়।
কূটনীতিকদের মতে, চীনের প্রভাব যেখানে বেশি, সেই সব বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের ভূমিকা বাড়ানো বেইজিংয়ের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। অন্যদিকে, তারিক রহমানের জন্য এই ধরনের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া মানে ভারতের বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করা এবং দেশের ভেতরে মর্যাদা বৃদ্ধি।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রই এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। চিন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় আরও সহযোগিতা, বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও কৃষির আধুনিকীকরণে সহায়তা, এবং সরবরাহ শৃঙ্খল, ই-কমার্স ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ঘনিষ্ঠ সংযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, চিন বাংলাদেশের জন্য ১০০ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যখন ক্রমশ জটিল হচ্ছে, তখন এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে এবং চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে সাহায্য করতে পারে।
দুই দেশ মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চিনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল দ্রুত গড়ে তোলার বিষয়েও একমত হয়েছে। ভারতীয় কৌশলবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রকল্পগুলিকে আঞ্চলিক সংযোগ এবং চীনের বাড়তে থাকা প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে আসছেন।
তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চিনের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা ইস্যু ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল—একদিকে জলবণ্টন চুক্তি এখনও ঝুলে আছে, অন্যদিকে এই প্রকল্প ভারতের ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলের কাছাকাছি।
যৌথ বিবৃতিতে সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
যদিও বিস্তারিত তথ্য নেই, তবু বঙ্গোপসাগর এখন ক্রমশ কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যেখানে চিনের অর্থনৈতিক স্বার্থ ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।মরিশাসের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জি বলেন, ‘এই চুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। একইসঙ্গে তারিক রহমান যখন দিল্লি আসবেন, তখন আমাদের নিজেদের স্বার্থও জোর দিয়ে তুলে ধরতে হবে।’
আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান ও প্রত্যাবাসনে চিনের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিকে শুধুমাত্র চিনের দিকে বাংলাদেশের ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাংলাদেশ বরাবরই বড় শক্তিগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার নীতি অনুসরণ করেছে। ভারত এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সহযোগী এবং যোগাযোগের প্রধান সেতু।
পরিবর্তন হয়েছে একটাই—বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বহুমুখী কূটনীতি চালাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘তারিক রহমান সরকারের চিনা বিনিয়োগ গ্রহণ, চিন-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানে যোগদানের আগ্রহ এবং নিরাপত্তা সংলাপ বাড়ানোর ইচ্ছা—সবই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর প্রচেষ্টা।’ নয়াদিল্লির কাছে চ্যালেঞ্জ এখন শুধু বেইজিংকে ঠেকানো নয়, বরং বাংলাদেশকে এমন কারণ দেখানো, যাতে তারা তাদের কৌশলগত চিন্তায় ভারতকে কেন্দ্রে রাখে।