এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা। স্কটল্যান্ডের (Scotland) এডিনবরায় (Edinburgh) দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের প্রাচীনতম শল্যচিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস (Royal College of Surgeons of Edinburgh)। ১৫০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত, ৫২১ বছরের পুরনো এই সংস্থার ঐতিহাসিক প্লেফেয়ার অডিটোরিয়ামে (Playfair Auditorium) গত ১৯ জুন স্থাপিত হল একটি ৯০ কেজি ওজনের ব্রোঞ্জের মূর্তি। মূর্তিটি এক প্রাচীন ভারতীয় ঋষির। যাঁর নাম, মহর্ষি সুশ্রুত।
যিনি আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বারাণসীর ঘাটে বসে লিখেছিলেন সুশ্রুত সংহিতা (Sushruta Samhita), পৃথিবীর প্রথম শল্যচিকিৎসা গ্রন্থ।
যে ভাবে তৈরি হল ইতিহাস
এডিনবরার ঘটনাটা নিছক একটা মূর্তি স্থাপনের নয়। এর পেছনে আছে একজন তেলুগু বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সার্জনের বছরের পর বছরের পরিশ্রম। তিনি অধ্যাপক চন্দ্র চেরুভু (Professor Chandra Cheruvu)।
তাঁর পরিবারের প্রতিষ্ঠান ‘চেরুভু ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন (Cheruvu Family Foundation)’ এই মূর্তি তৈরির সমস্ত ব্যয় বহন করেছে। তামিলনাড়ুর কুম্বকোণমের কাছে স্বামীমালাইয়ের (Swamimalai) কারিগররা হাজার বছরের পুরনো লস্ট-ওয়্যাক্স (Lost-wax) পদ্ধতিতে ঢালাই করেছেন সেই ব্রোঞ্জ। তার পর কাস্টমসের ঝামেলা পেরিয়ে মূর্তি পৌঁছেছে স্কটল্যান্ডে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এডিনবরায় ভারতের কনসাল জেনারেল সিদ্ধার্থ মালিক (Siddharth Malik), আরসিএস-এর বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ক্লেয়ার ম্যাকনট (Professor Clare McNaught)-সহ একাধিক সার্জন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূর্তিটি তাদের হেরিটেজ কালেকশনে (Heritage Collection) যুক্ত হয়েছে। এবং প্লেফেয়ার হলের সিঁড়ির পাশে দাঁড় করানো হয়েছে, যেখান দিয়ে সার্জনরা প্রতিদিন ডিগ্রি নিতে যান।
মেলবোর্নের ছবিটাও একই রকম স্পষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার রয়্যাল অস্ট্রেলেশিয়ান কলেজ অব সার্জনসে (Royal Australasian College of Surgeons ) সুশ্রুতের মার্বেল মূর্তি স্থাপিত হয়েছিল ২০১৮ সালের জুনে। ওই মূর্তিটি গ্রানাইটের ভিত্তির উপর ১.২ মিটার উঁচু, ওজন ৫৫০ কেজি। দিয়েছিলেন আরেক কিংবদন্তি ভারতীয় হৃদশল্য চিকিৎসক ডা. কে এম চেরিয়ান (Dr. K.M. Cherian), যিনি ভারতে প্রথম সফল করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি করেছিলেন।
দুটি ঘটনা, দুটি ভিন্ন উদ্যোগ, দুজন ভারতীয় চিকিৎসকের স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা। কিন্তু সেখানেও অনুচ্চারিত উজ্জ্বল যোগগুরু রামদেব ও আচার্য বালকৃষ্ণের শ্রম ও পরিচর্যা। তাঁদেরই নিবিড় সাধনায় পতঞ্জলি যোগপীঠের মাধ্যমে খুলে গিয়েছে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাচর্চার নতুন দিগন্ত।
বিশ্ব মানচিত্রে পতঞ্জলির স্বাক্ষর
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পতঞ্জলি যোগপীঠের (Patanjali Yogpeeth) তরফে আচার্য বালকৃষ্ণ (Acharya Balkrishna) একটি পোস্ট করেছেন। তিনি গর্বের সঙ্গে জানিয়েছেন, ২০ বছর আগে পতঞ্জলিতে যে দিব্য স্বরূপ কল্পনা করা হয়েছিল, সেটাই আজ বিশ্বের সুপরিচিত ও বিখ্যাত চিকিৎসা সংস্থায় স্থান পাচ্ছে। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলাই যায়, এ কথা অনস্বীকার্য যে এ হেন স্বর্ণিম বিশ্বস্বীকৃতির অন্তরালেও কোথাও গভীরে প্রোথিত রয়েছে পতঞ্জলির অবদান।
সুশ্রুত নিজগুণেই মহীরুহ
এই প্রসঙ্গে এটাও বলা দরকার, মহর্ষি সুশ্রুতের কৃতিত্ব প্রমাণ করতে কোনও আধুনিক প্রতিষ্ঠানের ছত্রচ্ছায়ার প্রয়োজন নেই। তিনি প্রায় ২,৬০০ বছর আগে ৩০০-রও বেশি ধরনের অস্ত্রোপচার করেছিলেন এবং ১২৪ রকমের শল্যচিকিৎসার উপযোগী যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছিলেন। আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির ভিত্তিও আদতে তাঁর লেখা সুশ্রুত সংহিতা।
রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস জানিয়েছে, এই মূর্তি স্থাপন আসলে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাপদ্ধতি এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্রের প্রতীক।
মূর্তিটি এখন প্লেফেয়ার হলের সিঁড়ির পাশে স্থায়ীভাবে রয়েছে। প্রতিদিন সার্জনরা ডিগ্রি নিতে যাওয়ার পথে এর পাশ দিয়ে হাঁটবেন। এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কিছু হতে পারে?
একটা প্রশ্ন, যা ভাবার মতো
এই উদযাপনের ভিড়ে একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই বলছেন, যখন একটা বিদেশি প্রতিষ্ঠান সুশ্রুতকে সম্মান জানায়, তখন একটা প্রশ্ন জাগে। এবং সেটা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়। নিজের দেশের মহীরুহদের চিনতেও আমরা কেন কখনও বিদেশি স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করি?
উত্তরটা আমাদের কাছেই আছে। প্রাচীন ভারতীয় উৎকর্ষের প্রতি দায়বন্ধ আর যত্নবান হতেই হবে আমাদের। যে কাজটি অত্যন্ত সুনিপুণ অধ্যবসায়ের সঙ্গে করে চলেছে পতঞ্জলি যোগপীঠ।




