• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 24 June, 2026

জোড়াফুলের দখলযুদ্ধ

তৃণমূল কংগ্রেসের এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তও পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস, যে দলটি দীর্ঘদিন ধরে একক নেতৃত্বে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, আজ সেই দলই ভাঙনের মুখে। প্রশ্ন উঠছে— দল কি ভাঙবে, না প্রতীক হারাবে? আর যদি প্রতীক নিয়েই লড়াই হয়, তবে কার হাতে যাবে ‘জোড়াফুল’?
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতরে অসন্তোষ জমছিল। সেই অসন্তোষ প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। বিদ্রোহী বিধায়কদের একাংশ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে, শুধু নতুন কমিটি গঠন করেই থামেনি— তারা সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেয়ারপার্সন পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তও পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।
এই ঘটনাকে শুধু দলীয় কোন্দল বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ— তার প্রতীক। ‘জোড়াফুল’ শুধু একটি চিহ্ন নয়, এটি তৃণমূলের রাজনৈতিক পরিচয়, আবেগ এবং সংগঠনের প্রতীক। সেই প্রতীক নিয়েই এখন শুরু হয়েছে দখলযুদ্ধ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের কাছে যে গোষ্ঠী নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারবে, তারাই প্রতীক পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। এই জায়গাতেই ঋতব্রত গোষ্ঠী কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তাদের দাবি— দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক ও সাংসদ তাদের সঙ্গে রয়েছে।
তবে সমস্যা আরও জটিল হয়েছে অন্য একটি কারণে। তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির একক নয়। একদিকে রয়েছে ঋতব্রতদের গোষ্ঠী, অন্যদিকে শতাব্দী রায় ও কাকলি ঘোষদস্তিদারদের নেতৃত্বে আরেকটি গোষ্ঠী, যারা ইতিমধ্যেই এনসিপিআই-তে যোগ দিয়েছে। তারাও আবার জোড়াফুল প্রতীকের দাবিতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে এই লড়াই এখন ত্রিমুখী— মমতা শিবির বনাম ঋতব্রত শিবির বনাম এনসিপিআই-তে যাওয়া প্রাক্তন তৃণমূল নেতারা।
এই পরিস্থিতি নতুন নয়। মহারাষ্ট্রে আমরা এর আগেও একই ধরনের ঘটনা দেখেছি। শিবসেনা এবং এনসিপি— দুটি দলই ভাঙনের পর প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ে জড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একনাথ শিন্ডে ও অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠীর হাতে প্রতীক তুলে দেয়। আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, সংগঠনগত শক্তিই এখানে শেষ কথা।
কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এখানে বিদ্রোহীরা একজোট নয়। এই বিভক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে কিছুটা সুবিধা তৈরি করতে পারে। কারণ, ভোট ভাগ হয়ে গেলে বা দাবি দুর্বল হলে, কমিশন ‘মূল দল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বকেই অগ্রাধিকার দিতে পারে।
তবে এটাও ঠিক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে দলকে নিজের ব্যক্তিত্বের উপর দাঁড় করালেও, এই প্রথমবার সংগঠনের ভিত এতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। যদি সত্যিই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক ও সাংসদ তাঁর বিরুদ্ধে চলে যান, তবে প্রতীক রক্ষা করাও কঠিন হয়ে উঠবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জনমত। সাধারণ ভোটারদের কাছে ‘জোড়াফুল’ মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আবেগ এখনও কতটা অটুট, সেটাও এই লড়াইয়ের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। প্রতীক আইনি ভাবে এক গোষ্ঠীর হাতে গেলেও, মানুষের মনে তার গ্রহণযোগ্যতা অন্য কারও হতে পারে— এমন ঘটনাও রাজনীতিতে নতুন নয়।
সব মিলিয়ে, তৃণমূল কংগ্রেস এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই লড়াই শুধু ক্ষমতার নয়, পরিচয়েরও। দল কি তার প্রতিষ্ঠাতার হাতেই থাকবে, না কি নতুন নেতৃত্বের হাতে নতুন রূপ নেবে— সেই উত্তরই খুঁজছে গোটা রাজ্য।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন এবং প্রয়োজনে আদালত। কিন্তু তার আগে যে রাজনৈতিক নাটক আরও তীব্র হবে, তা বলাই যায়। জোড়াফুলের বাগানে কার ফুল ফুটবে— ঋতব্রত, কাকলি না মমতা— সেই উত্তর সময়ই দেবে।