• facebook
  • twitter
  • youtube
Friday, 9 October, 2026

পথ চলার অধিকার

সংবিধানের তৃতীয় ভাগে যে জীবনের অধিকার ও স্বাধীন চলাচলের অধিকার স্বীকৃত, তারই অন্তর্গত এই হাঁটার অধিকার

পথ চলার অধিকার

Supreme Court Photo-SNS

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে— হাঁটা বা পথ চলা নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে যে জীবনের অধিকার ও স্বাধীন চলাচলের অধিকার স্বীকৃত, তারই অন্তর্গত এই হাঁটার অধিকার। এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক গভীর বাস্তব সমস্যার দিকে আঙুল তুলে দেয়।
ঘটনার সূত্রপাত এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে— স্কুলে যাওয়ার পথে একটি পাঁচ বছরের শিশুর মৃত্যু। এই মৃত্যু যেন আমাদের শহর ও গ্রামের পথঘাটের প্রকৃত চেহারাকে নগ্ন করে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, রাস্তা কি শুধুই মোটরগাড়ির জন্য? পথচারীর জন্য কি এই দেশে নিরাপদ জায়গা নেই?
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, যেখানে রাস্তা আছে, সেখানে ফুটপাত থাকা বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, এই ফুটপাত হতে হবে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত, বাধাহীন এবং নিরাপদ।
আদালত আরও জানিয়েছে, পথচারীর অধিকারকে মোটরযানের চলাচলের চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই বক্তব্য আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে শহর পরিকল্পনা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই গাড়িকেন্দ্রিক।বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কলকাতা হোক বা অন্য শহর, ফুটপাত প্রায়শই দখল হয়ে থাকে— হকার, বেআইনি নির্মাণ, পার্কিং কিংবা আবর্জনার স্তূপে। ফলে পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তার উপর দিয়ে হাঁটেন, যা বিপজ্জনক।
দুর্ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি খুব একটা আলাদা নয়— সেখানে তো ফুটপাতের ধারণাই অনেক সময় অনুপস্থিত।আদালত এই প্রসঙ্গে দায়িত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে— নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পুরসভা, পৌরসভা এবং পঞ্চায়েত— সকলেরই কর্তব্য ফুটপাত নির্মাণ, সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা। অর্থাৎ, এটি আর কোনও ঐচ্ছিক কাজ নয়, বরং একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এই রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যদি কারও হাঁটার অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তবে তিনি সরাসরি উচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করতে পারবেন এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন। এর ফলে প্রশাসনের ওপর এক নতুন চাপ তৈরি হবে, যা হয়তো বাস্তব পরিবর্তনের পথে সহায়ক হতে পারে।তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— শুধু রায়ে কি বাস্তব বদলাবে? অতীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি হয়েছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন প্রায়শই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ফুটপাত নির্মাণের জন্য শুধু পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নাগরিক সচেতনতা।আসলে, হাঁটা শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার উপায় নয়। এটি আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ এবং মানবিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধর্মীয় পদযাত্রা, রাজনৈতিক পদযাত্রা, প্রতিবাদের মিছিল—সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে এই হাঁটা। তাই এটিকে শুধুমাত্র ‘চলাচল’ হিসেবে দেখা ভুল; এটি এক ধরনের সামাজিক ও গণতান্ত্রিক প্রকাশ।
একটি সুন্দর, প্রশস্ত ও নিরাপদ ফুটপাত শুধু পথচারীর সুবিধাই বাড়ায় না, বরং শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলাও বৃদ্ধি করে। এটি পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রাকে উৎসাহ দেয়, যানজট কমায় এবং জনস্বাস্থ্য উন্নত করে। বিশ্বে উন্নত শহরগুলিতে পথচারী-বান্ধব পরিকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়— আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।
হাঁটার অধিকার আসলে ন্যূনতম মানবিক দাবি। এটি কোনও বিলাসিতা নয়, বরং একটি মৌলিক প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় আমাদের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে— আমরা কি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সত্যিই পথচারী-বান্ধব সমাজ গড়তে পারব, নাকি এটিও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে— সেই উত্তর এখন সময় দেবে।