একটি সোনালি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল ইস্টবেঙ্গলে। একটা বিশ্বাস নিয়ে এসেছিলেন অস্কার ব্রুজোন, বিশ্বাস করতেন, একটু সময় পেলে একদিন না একদিন লাল-হলুদ বাহিনীকে দুঃসময়ের অন্ধকার থেকে আলোয় আনা যাবে। সেই বিশ্বাসকে বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে প্রবল চাপের মুখোমুখিও হয়েছিলেন। কিন্তু শনিবার বিদায় নিলেন এমন এক মানুষ হিসেবে, যিনি লাল-হলুদ ব্রিগেডকে তাদের ইতিহাসের প্রথম আইএসএল খেতাব এনে দিয়ে ইতিহাস রচনা করেছেন।
সন্দেহ থেকে স্বপ্ন দেখার দিনে, হৃদয়ভঙ্গ থেকে গৌরবের দিনে— ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে তাঁর যাত্রা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সাহস, দৃঢ় বিশ্বাস এবং সাফল্যের এক অনন্য কাহিনি হিসেবে। কিছু কোচ ম্যাচ জেতেন। কিছু কোচ ট্রফি জেতেন। কিন্তু খুব অল্প কয়েকজনই আসেন, যাঁরা হৃদয়ও জিতে নেন। তাঁরা এমন স্মৃতি রেখে যান, যা কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। অস্কার ব্রুজোন সেই বিরল শ্রেণিরই একজন।
শনিবার রাতে ইস্টবেঙ্গলকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে এই বাংলা শ্রদ্ধা জানিয়েছে এমন এক কোচকে, যিনি ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের উপহার দিয়েছেন আজীবন মনে রাখার মতো অসংখ্য স্মৃতি। তাঁর একটা বড় ধন্যবাদ প্রাপ্য, ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের বিশ্বাস করানোর জন্য যে, স্বপ্ন সত্যিই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু এমন একজন কোচের সঙ্গে কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়েও কেন শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হল? এই প্রশ্নই এখন চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেন শেষ পর্যন্ত লাল-হলুদ বাহিনীতে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন স্প্যানিশ কোচ? খুব ভাল মনে যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছেন, তা নয়। বরং এই সিদ্ধান্ত নিতে তিনি বাধ্য হয়েছেন বলা যায়।
একজন ইস্টবেঙ্গল ভক্ত হলেও তিনি একজন পেশাদার কোচ। তাঁকেও ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হয়। কোচ হিসেবে ইস্টবেঙ্গলকে যে ভারতের এক নম্বর লিগ খেতাব পাইয়ে দিয়েছেন তিনি, তা অস্কার ব্রুজোনের ‘সিভি’ তে উজ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে। এবং পরবর্তী কোনও ক্লাবে মোটা অঙ্কের চুক্তি করার জন্য এটাই ছিল তাঁর কাছে সেরা সময়।
অস্কারের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গিয়েছে, আইএসএল জয়ের সময় থেকেই ইন্দোনেশিয়ার একটি ক্লাব তাঁর এজেন্টের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছিল। একজন খেতাবজয়ী কোচকে নেওয়ার দৌড়ে ছিল আরও কয়েকটি ক্লাব। কিন্তু সব দেখেশুনে ও বিচার-বিবেচনা করে ইন্দোনেশিয়ার সেই ‘ভয়ঙ্করা প্রেসিসি লামপুং এফসি’-র সঙ্গেই চুক্তিবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা অনেক এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তিনি।
আইএসএলের পরেই কার্যত বিদায়ের বার্তা দিয়েই দিয়েছিলেন অস্কার। ইস্টবেঙ্গলও নতুন করে কোচ খোঁজা শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু ফের অস্কারের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করে তারা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, অস্কারের নতুন চুক্তিতে সই করা যেন সময়ের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু শনিবার সবার হৃদয় চুর্ণ-বিচুর্ণ করে দিয়ে স্প্যানিশ কোচ জানিয়ে দিলেন, ‘অনেক ভেবে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ইস্টবেঙ্গলে আর কাজ করব না।
এটা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না, তবে আমার কেরিয়ারের এই পরবর্তী পর্যায়ের জন্য এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত। আমরা একসঙ্গে যে সাফল্য অর্জন করেছি, তার জন্য আমি গর্বিত। এএফসি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে পৌঁছনো, ২২ বছরের অপেক্ষার পর আইএসএল খেতাব জয় এবং দুটি মেজর কাপ ফাইনালে ওঠা। ক্লাব ম্যানেজমেন্ট, খেলোয়াড়, স্টাফ এবং অসাধারণ সমর্থকেরা ছাড়া, যারা পুরো মরশুম জুড়ে আমাদের পাশে ছিলেন, তাদের ছাড়া এ সবকিছু সম্ভব হত না। সবাইকে ধন্যবাদ। আমার পরবর্তী অধ্যায় যথাসময়ে জানাব।‘
কিন্তু ঘুরেফিরে সেই একটাই প্রশ্ন আসছে, কেন হঠাৎ মত পরিবর্তন করলেন অস্কার ব্রুজোন? কেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আশার আলো দেখিয়েও তাদের হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিলেন? তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গিয়েছে মূলত দুটি কারণের কথা। প্রথমত, তিনি দলে তাঁর পছন্দের তিন বিদেশি ফুটবলার কেভিন সিবিয়ে, মহম্মদ রশিদ এবং মিগুয়েলকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিগুয়েল ইতিমধ্যেই মোহনবাগানে সই করেছেন। অন্যদিকে, কেভিন সিবিয়ের সঙ্গে এখনও চূড়ান্ত কথাবার্তা হয়নি ইস্টবেঙ্গলের।
একমাত্র মহম্মদ রশিদকে ইস্টবেঙ্গল রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধও হয়েছে। কিন্তু তিনজনকেই না পাওয়া একেবারেই পছন্দ হননি অস্কার। তাঁর কথার অন্যথা হলে যে বরাবরই তা ভাল ভাবে নেন না, তা ক্লাব কর্তা, স্টাফ ও খেলোয়াড়রা ভাল করেই জানেন। এক্ষেত্রে সম্ভবত সেটাই হয়েছে।
অপর কারণ, ইনভেস্টর নিয়ে এখনও ক্লাব ম্যানেজমেন্টের টালবাহানা করা। আইএসএল শুরু হবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, আর মাত্র দু’মাস পরেই। এখনও যদি ইনভেস্টর নিয়ে কথাবার্তা চূড়ান্ত না হয়, তা হলে কী ভাবে একটা ভাল দল গড়া যাবে, মিগুয়েল, কেভিনের বদলি কী ভাবে আনা যাবে, এই সব প্রশ্নের সদুত্তর তাঁকে দিতে পারেননি ক্লাবের কর্তারা।
একদিকে যেমন ক্লাবের ইনভেস্টর নিয়ে অনিশ্চয়তা, তেমনই আইএসএলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষক নিয়েও কম অনিশ্চয়তা নেই। দুই দিক থেকেই কোনও অনিশ্চয়তা না পেয়ে ভারতে না থাকার সিদ্ধান্তই নেন অস্কার। গত মরসুম যে ভাবে কাটিয়েছিলেন তিনি, সারা মরসুম ধরেই অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ছিল মাথার ওপর। এ বার আর সেই অবস্থার মধ্যে থাকতে চান না তিনি। সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেন।
এখন ইস্টবেঙ্গলের নতুন কোচ খোঁজার পালা। কিন্তু নতুন কোচ যখন ইনভেস্টর, ক্লাবের আর্থিক বিষয়ে খোঁজ নেবেন, তখন তাঁকে বা তাঁদের কী বোঝাবেন লাল-হলুদ কর্তারা, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পেশাদার ফুটবলে আর্থিক নিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় বিষয়। অর্থই যদি পর্যাপ্ত না থাকে, তা হলে পেশাদারিত্ব দেখাবার জায়গাটাই তো তৈরি হয় না। তাই ক্লাবের এই আর্থিক অবস্থা দেখে কোন কোচ তাদের দলের দায়িত্ব নিতে রাজি হবেন, এর চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর কিছু নেই।




