বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রশ্নটা অনেকেই তুলেছিলেন— লিওনেল মেসি আবার কেন? চার বছর আগে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেওয়ার পর কি তাঁর আর কিছু প্রমাণ করার বাকি ছিল? বয়স প্রায় ৩৯-এর দোরগোড়ায়। শরীর কি আগের মতো সাড়া দেবে? সেই পুরোনো জাদু কি এখনও অবশিষ্ট আছে?
কিন্তু ফুটবল যেমন যুক্তির খেলা, তেমনই আবেগেরও। আর সেই আবেগের নাম যদি মেসি হয়, তাহলে সন্দেহের জায়গা খুব বেশি থাকে না। তবু প্রশ্ন উঠেছিল। আর সেই প্রশ্নের জবাব মেসি দিলেন মাঠেই— এক নিখুঁত হ্যাটট্রিক দিয়ে।
কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে প্রায় ৭০ হাজার দর্শকের সামনে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ৩-০ ব্যবধানে জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, এটি ছিল এক ঘোষণাও— মেসি এখনও শেষ হয়ে যাননি। বরং বলা ভালো, তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম হ্যাটট্রিক করলেন মেসি। অথচ তাঁর ক্যারিয়ার দুই দশকেরও বেশি দীর্ঘ। ঠিক ২০ বছর আগে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করার দিনটির স্মৃতিকে যেন নতুন আলোয় ফিরিয়ে আনলেন তিনি। আর সেই সঙ্গে ছুঁয়ে ফেললেন জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজের ১৬ গোলের রেকর্ড। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, এটি এক যুগের সাক্ষ্য।
এখন প্রশ্ন উঠছে— গোল্ডেন বুট কার? বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারটি নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে লড়াই। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, নরওয়ের এরলিং হালান্ড, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন— সবাই নিজেদের ছাপ রাখতে শুরু করেছেন। তরুণদের এই ঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মেসি যেন এক অভিজ্ঞ শিল্পী, যিনি জানেন কখন কোন তুলি চালাতে হয়।
কিন্তু এই প্রতিযোগিতা কেবল গোলের সংখ্যা নিয়ে নয়, এটি এক প্রতীকের লড়াইও। একদিকে ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের নাম মেসি।
বিশ্বজুড়ে মেসি-ভক্তদের কাছে এই বিশ্বকাপ যেন এক আবেগের সফর। তাঁরা জানেন, হয়তো এটি মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাই প্রতিটি গোল, প্রতিটি পাস, প্রতিটি মুহূর্ত তাঁদের কাছে অমূল্য। আর সেই কারণেই অনেকেই চাইছেন— এই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটও যেন মেসির হাতেই ওঠে। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত পুরস্কার হবে না, এটি হবে এক যুগের প্রতি শ্রদ্ধা।
মেসির খেলা সবসময়ই সংখ্যার বাইরে। তিনি শুধু গোল করেন না, তিনি খেলাকে সুন্দর করে তোলেন। তাঁর পায়ে বল থাকলে সময় যেন একটু ধীর হয়ে যায়। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর সিদ্ধান্ত, তাঁর মুভমেন্ট— সবকিছুতেই থাকে এক অদ্ভুত নৈপুণ্য। এই কারণেই তিনি শুধুমাত্র একজন ফুটবলার নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক আইকন।
এই বিশ্বকাপের শুরুই যদি এমন হয়, তাহলে সামনে কী অপেক্ষা করছে তা নিয়ে কৌতূহল আরও বাড়ে। রেকর্ড ভাঙবে, নতুন নায়ক উঠে আসবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেও যদি একজন মানুষ আলাদা করে আলো কেড়ে নেন, তিনি নিঃসন্দেহে মেসি।
সময় হয়তো কাউকে ছাড় দেয় না, কিন্তু কিছু মানুষ সময়কে চ্যালেঞ্জ করেন। মেসি সেই বিরল মানুষদের একজন। তাঁর খেলা প্রমাণ করে, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। ইচ্ছাশক্তি, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিভার সমন্বয় হলে কী সম্ভব, তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি।
এই বিশ্বকাপের গল্প এখনও অনেক বাকি। কিন্তু শুরুটা যে মেসির, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর যদি শেষটাও তাঁর হয়— যদি গোল্ডেন বুট তাঁর হাতে ওঠে— তাহলে সেটি হবে শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য পরিণতি।
মেসি ম্যাজিক এখনও বেঁচে আছে। আর যতদিন তা থাকবে, ততদিন ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এক শিল্প হিসেবেই বেঁচে থাকবে।




