• facebook
  • twitter
  • youtube
Thursday, 18 June, 2026

শরীর-মন-প্রাণের আরাম, যোগ-প্রাণায়াম

যোগ শাস্ত্রের প্রাণ পুরুষ মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন, ‘স্থিরম সুখম আসনম।’ ​ভারত অতি প্রাচীন আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন দেশ।

যোগ শাস্ত্রের প্রাণ পুরুষ মহর্ষি পতঞ্জলি বলেছেন, ‘স্থিরম সুখম আসনম।’ ​ভারত অতি প্রাচীন আধ্যাত্মিক চেতনা সম্পন্ন দেশ। এই পবিত্র ভূমিতেই জন্ম নিয়েছে এক অতি প্রাচীন অনন্য ভারতীয় বিজ্ঞান— যোগ ও প্রাণায়াম। এটি কেবল মাত্র কিছু শারীরিক কসরত বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম নয়; এটি হলো শরীর, মন এবং প্রাণের মধ্যে এক পরম সামঞ্জস্য তৈরির বিজ্ঞানসম্মত পথ। হাজার হাজার বছর ধরে এই বিদ্যা আমাদের জীবনকে আলোড়িত করে আসছে। আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং ক্লান্তির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নিজেকে ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো এই যোগ-প্রাণায়াম। এটি মানুষের জীবনকে এমনভাবে বদলে দেয় এবং চেতনার দিগন্তকে প্রসারিত করে, যা সত্যিই কল্পনাতীত। সেজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যোগ প্রাণায়াম আজ বিশেষভাবে সমাদৃত। গর্বের বিষয় হলো, ভারতীয় যোগ বিজ্ঞানীরা আজ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে সুনাম ও সম্মানের সঙ্গে যোগশিক্ষা দিচ্ছেন ‌
​​যোগের শিকড় প্রোথিত রয়েছে ভারতের প্রাচীনতম গ্রন্থ বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ এবং মহাকাব্যের পাতায়। তবে প্রাচীনকালে এই অমূল্য বিদ্যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। হিমালয়ের গুহায় বা নির্জন আশ্রমে মুনি, ঋষি এবং সমাজের উচ্চস্তরের কিছু সাধকদের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। ​গত কয়েক দশকে সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগ-প্রাণায়ামের প্রচলন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজ এটি আর কোনো রহস্যময় সাধনা নয়, বরং ঘরের কাছের এক পরম বন্ধু। বিভিন্ন জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে এর অভাবনীয় উপকারিতা দেখে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং চিকিৎসকরাও এখন রোগীদের নিয়মিত যোগাভ্যাসের সুপারিশ করছেন। এর ফলে বহু রোগী দীর্ঘদিনের কঠিন অসুখ থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন।
​​যোগ ও প্রাণায়াম সম্পর্কে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখা প্রয়োজন। এটি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের অঙ্গ নয়। এটি হলো একটি সর্বজনীন জীবনযাপন পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য হলো, সুস্থ দেহে সুস্থ মন গড়ে তোলা। ​‘যোগ’ শব্দটির অর্থ হলো মিলন। কিসের মিলন? এটি মানুষকে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে তোলে। অহংকার আর ভেদাভেদ ভুলে পরম চেতনার সঙ্গে এই যে আত্মিক মিলন, এটাই হলো আসল যোগ। তাই ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে যে কেউ এই পদ্ধতি আপন করে নিতে পারেন।​ মহর্ষি পতঞ্জলিকে যোগ শাস্ত্রের জনক বা প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। সময়ের বিবর্তনে এবং বিভিন্ন আচার্যদের হাত ধরে যোগের নানাবিধ শাখার বিকাশ ঘটেছে। এদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা রয়েছে৷ যেমন—
অষ্টাঙ্গ যোগ— যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি— এই আটটি স্তরের মাধ্যমে শরীর ও মনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। আয়েঙ্গার যোগ— নিখুঁত শারীরিক ভঙ্গির উপর এতে জোর দেওয়া হয়। প্রয়োজনে বেল্ট, ব্লক ইত্যাদি সরঞ্জামের সাহায্য নেওয়া হয়।
কুণ্ডলিনী যোগ— মেরুদণ্ডের নিচে সুপ্ত থাকা শক্তিকে জাগিয়ে তোলার আধ্যাত্মিক অনুশীলন।
ইন যোগ—​ অত্যন্ত ধীর-স্থির এবং দীর্ঘ সময় ধরে এক একটি আসনে স্থির থাকার অভ্যাস, যা মনের শান্তি বাড়ায়।
​এই বিভিন্ন শাখার মূল উদ্দেশ্য একটাই, শারীরিক ও মানসিক মেলবন্ধন ঘটানো এবং মনের চঞ্চলতাকে শান্ত করা।
​​যোগ-প্রাণায়াম যে শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির চাবিকাঠি নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক দারুণ হাতিয়ার, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে। একটি সত্য ঘটনা দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা সম্ভব। পূর্ব ​মেদিনীপুরের ঐতিহাসিক শহর তমলুকের বাসিন্দা অরুণবাবু ও বিপ্লববাবু (নাম পরিবর্তিত) কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর ঘরে বসে অলস সময় না কাটিয়ে সমাজকল্যাণে এক অভিনব উদ্যোগ নেন। প্রতিদিন সকালবেলা তমলুক রেলস্টেশনের চত্বরে দু’জনে মিলে যোগ-ব্যায়াম শুরু করেন। শুরুতে সমাজ তাঁদের সহজে মেনে নেয়নি। চারপাশের মানুষ কানাঘুষা করত, নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ধেয়ে আসত। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলত, ‘দুই বুড়োর নাচন-কোদন দেখতে হলে ভোরবেলা স্টেশনে যেতে হবে।’ ​কিন্তু দুই বন্ধু দমে যাননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল স্থির, আর মনের জোর ছিল অটুট! মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। আজ প্রতিদিন ভোর পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ওই রেলস্টেশনে একশোরও বেশি প্রবীণ ও বয়স্ক মানুষ ছুটে আসেন। সেখানে নিয়মিত খালি হাতে ব্যায়াম, বিভিন্ন আসন, ধ্যান, প্রাণায়াম এবং মুক্তকণ্ঠে হাসি অনুশীলন করা হয়। রেলস্টেশনের সেই চত্বর এখন এক আনন্দধামে পরিণত হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এই অভিনব ক্লাবের সুনাম। নিন্দুকেরা আজ প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দুই বন্ধুর কথায়—
‘যোগের এই যে অমূল্য প্রাণশক্তি, একে বহু মানুষের মনে ও প্রাণে ছড়িয়ে দিতে পেরে আজ আমাদের জীবন ধন্য।’ এটিই হলো যোগের আসল শক্তি, যা মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে এবং একাকিত্ব দূর করে বেঁচে থাকার নতুন রসদ জোগায়। বিভিন্ন জায়গায় এখন ছোট থেকে বড় সকলের জন্য যোগ প্রাণায়াম শেখানোর সংস্থা রয়েছে।
​​নিয়মিত যোগ ও প্রাণায়াম আমাদের শরীরে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। আসন অনুশীলনের ফলে শরীরের নমনীয়তা বা ফ্লেক্সিবিলিটি বাড়ে, পেশি শক্তিশালী হয় এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত হয়। এটি হজমশক্তি বাড়াতে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর। প্রাণায়াম বা শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। এর ফলে আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু— মানসিক চাপ, অবসাদ ও উদ্বেগ দ্রুত হ্রাস পায়। প্রতিদিন ধ্যানের অভ্যাস মনের একাগ্রতা বাড়ায়। ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, সবার জন্যই এটি সমান উপকারী।
​যোগ-প্রাণায়াম কোনও অলৌকিক জাদু নয়, এটি এক পরম বিজ্ঞানসম্মত সত্য। নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময়ে এর অভ্যাস জীবন বদলে দিতে পারে। পৃথিবীতে সুস্থ, সুন্দর ও দীর্ঘ জীবন লাভ করার জন্য এর চেয়ে সহজ ও স্বাভাবিক পথ আর দুটি নেই। অনেক মানুষ আজ নিয়মিত যোগ-প্রাণায়াম করে সম্পূর্ণ সুস্থ ও আনন্দময় জীবনযাপন করছেন।​ তাই আসুন, অলসতা আর ব্যস্ততার অজুহাত দূরে সরিয়ে রেখে আমরাও আজ থেকেই এই সুন্দর অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হই। প্রতিদিন মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট নিজের শরীর ও মনকে দিলে, সেটা বাকি ২৩ ঘণ্টা আমাদের অফুরন্ত এনার্জি ও শান্তি ফিরিয়ে দেবে। সুস্থ মানুষ, সুস্থ সমাজ ও সুস্থ দেশ গড়তে যোগ-প্রাণায়াম হোক আমাদের প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী।