• facebook
  • twitter
  • youtube
Tuesday, 9 June, 2026

আইএসএলে ক্লাব জোটের হাতেই ক্ষমতা, ভারতীয় ফুটবলে নতুন যুগের সূচনা?

নতুন মডেল যদি সফল হয়, তবে আইএসএল আরও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তর্জাতিক মানের লিগে পরিণত হতে পারে।

প্রতীকী চিত্র

ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘদিনের ক্ষমতার লড়াইয়ে অবশেষে জয় হল ইন্ডিয়ান সুপার লিগ-এর ক্লাবগুলির। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্য সোমবার যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ডেকেছিলেন, তার পর সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন আগামী চার বছরের জন্য ক্লাব-নেতৃত্বাধীন মডেল মেনে নিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে আইএসএল পরিচালনা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে ক্লাবগুলির ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এই সিদ্ধান্তকে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে ফেডারেশন এবং আইএসএল ক্লাবগুলির মধ্যে চলা অচলাবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে একাধিক ক্লাব লিগ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল।

কী ছিল বিরোধের মূল কারণ?

শিল্পগোষ্ঠী রিলায়্যান্সের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আইএসএলের বাণিজ্যিক অধিকার, লিগ পরিচালনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গত দু’বছর ধরেই অসন্তোষ ছিল ক্লাবগুলির মধ্যে। তাদের দাবি ছিল, বিপুল বিনিয়োগ করার পরও লিগের পরিচালনায় তাদের যথেষ্ট মতামত বা নিয়ন্ত্রণ নেই। ক্লাবগুলির মতে, যারা আর্থিক ঝুঁকি নিচ্ছে এবং ফুটবলার, কোচ ও পরিকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে, তাদেরই লিগ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া উচিত।

এই অভিযোগ করেই আইএসএলের চুক্তির মেয়াদ আর বৃদ্ধি করেনি রিলায়্যান্স। তাদের দাবি ছিল, ১৫ বছরে তারা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরেও চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের হাতে লিগের বেশিরভাগ ক্ষমতা দিতে রাজি ছিল না ফেডারেশন। সেই জন্যই তারা আর চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি।

অন্যদিকে, ফেডারেশন লিগের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চাওয়ার ক্লাবগুলির সঙ্গে তাদের টানাপোড়েন ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই টানাপোড়েনের জন্য ২০২৫-২৬ মরসুমের আইএসএল পূর্ণদৈর্ঘ্যের করা যায়নি। কোনও রকমে তিন মাসের মধ্যে শেষ করে দেওয়া হয় গত আইএসএল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ২০২৬-২৭ মরসুম আদৌ সময়মতো শুরু হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

এই জট ছাড়ানোর জন্যই সোমবার নয়াদিল্লিতে ক্রীড়ামন্ত্রীর ডাকে ফেডারেশন এবং আইএসএল ক্লাবগুলির প্রতিনিধিদের মধ্যে ম্যারাথন বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই চার বছরের একটি নতুন কাঠামো নিয়ে নীতিগত ভাবে একমত হয় সব পক্ষই। জানা গিয়েছে ক্রীড়ামন্ত্রী লিগের স্পনসর এনে দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছেন ও প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি প্রফুল প্যাটেল সম্প্রচারকারী সংস্থার সঙ্গে কথা বলে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করবেন বলে জানিয়েছেন।

ফেডারেশন কর্তারা এক্ষেত্রে কোনও দায়িত্ব পালনেরই প্রতিশ্রুতি দিতে পারেননি বলে বৈঠকে থাকা এক কর্তা জানান। সেই জন্যই শেষ পর্যন্ত ফেডারেশনের কাছে ক্লাব-নেতৃত্বাধীন মডেল মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। এর ফলে ২০২৬-২৭ মরসুমের লিগ নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই শুরু হওয়ার পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেল। ক্রীড়ামন্ত্রীও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে নতুন মরসুম সময়মতোই শুরু হবে।

নতুন মডেলে কী কী বদলাবে?

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী:
• লিগের দৈনন্দিন পরিচালনা ও বাণিজ্যিক বিষয়ে ক্লাবগুলির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
• সম্প্রচার, বিপণন বা মার্কেটিং, স্পনসরশিপ এবং প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্লাবগুলি আরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পাবে।
• নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ফেডারেশনই কাজ করবে এবং ফুটবলের প্রশাসনিক, শৃঙ্খলাজনিত ও প্রতিযোগিতামূলক বিষয়গুলির তদারকি করবে।
• এই ব্যবস্থা আপাতত চার বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।

নতুন সমঝোতার অংশ হিসেবে ১৪টি আইএসএল ক্লাব প্রত্যেকে বছরে ১.১ কোটি টাকা করে ফেডারেশনকে দেবে। অর্থাৎ বছরে মোট ১৫.৪ কোটি টাকা পাবে ফেডারেশন। ক্লাবগুলির যুক্তি, এই মডেল একদিকে যেমন ফেডারেশনের আয় নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে লিগ পরিচালনাতেও তাদের আরও সুবিধা হবে।

ভারতীয় ফুটবল বর্তমানে একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আইএসএল দেশের এক নম্বর পেশাদার লিগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও লিগের প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক সমস্যা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। অনেক ক্লাবই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং কয়েকটি ক্লাবের অস্তিত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে ক্লাব-নেতৃত্বাধীন মডেলকে অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন সফল লিগের কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। ক্লাবগুলির বিশ্বাস, এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং ভারতীয় ফুটবলের পেশাদার কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।

ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যত কী?

এই সমঝোতা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এতদিন যেখানে ফেডারেশন ছিল কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে এবার ক্লাবগুলিও কার্যত নীতিনির্ধারণের অংশ হয়ে উঠছে।
ফলে আগামী চার বছর ভারতীয় ফুটবলের জন্য একটি পরীক্ষামূলক অধ্যায় হতে চলেছে। নতুন মডেল যদি সফল হয়, তবে আইএসএল আরও আর্থিকভাবে স্বনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তর্জাতিক মানের লিগে পরিণত হতে পারে। কিন্তু যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আবারও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আপাতত ফেডারেশন ও ক্লাবগুলির এই সমঝোতায় ভারতীয় ফুটবলের আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ অনেকটাই কাটতে চলেছে বলা যায়।