• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 7 June, 2026

খাবারের থালার অদৃশ্য আততায়ী

মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা খাদ্য। খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়, সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর অন্যতম ভিত্তি।

দীপক সাহা

মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা খাদ্য। খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়, সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর অন্যতম ভিত্তি। অথচ সেই খাদ্যই যখন রোগ ও মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়, সভ্যতার জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দূষিত ও অনিরাপদ খাদ্যের কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এর সঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কয়েকশো কোটি মানুষ। খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন তাই আজ আর কেবল একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।
খাদ্যদূষণ বলতে সাধারণত এমন খাদ্যকে বোঝায়, যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, রাসায়নিক পদার্থ, ভারী ধাতু বা অন্য কোনও ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। সাম্প্রতিক বিস্তৃত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে খাদ্যদূষণজনিত অসুস্থতা, অপুষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং জটিলতার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
খাদ্যের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হাজার বছরের। কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং বাণিজ্যিক কৃষির প্রসারের ফলে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। একদিকে উৎপাদন বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অপব্যবহার এবং সংরক্ষণজনিত ঝুঁকি। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে শাকসবজি, ফলমূল ও শস্যে ক্ষতিকর উপাদান থেকে যাচ্ছে। মাছ ও মাংস উৎপাদনে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে নানা অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন। খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিকও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
দূষিত খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস জীবাণু। সালমোনেলা, ই-কোলাই, লিস্টেরিয়া, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টার প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়া খাদ্যবাহিত রোগের জন্য দায়ী। অপরিষ্কার পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, দূষিত জল ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রান্না বা ভুল সংরক্ষণ— এসব কারণে জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নিরাপদ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতির কারণে এই সমস্যা আরও প্রকট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা খাদ্যবাহিত রোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বজুড়ে খাদ্যবাহিত রোগজনিত মৃত্যুর একটি বড় অংশ এই শিশুদের মধ্যেই ঘটে। ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ, কৃমিজনিত সংক্রমণ এবং বিভিন্ন অন্ত্রের রোগ শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে অপুষ্টির সঙ্গে খাদ্যদূষণের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। খাদ্যদূষণের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হল রাসায়নিক দূষণ। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু যেমন সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম এবং শিল্পবর্জ্য থেকে আসা বিষাক্ত পদার্থ খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে এই উপাদান শরীরে জমতে থাকলে ক্যানসার, কিডনি রোগ, স্নায়বিক সমস্যা, হৃদরোগ এবং প্রজনন সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের বহু দেশে খাদ্যে ভেজাল আজ এক প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অধিক মুনাফার আশায় দুধে ডিটারজেন্ট, মশলায় কৃত্রিম রং, ফলে রাসায়নিক প্রলেপ, মাছ-মাংসে ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে এসব ভেজাল শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে মানুষ প্রতিদিন অজান্তেই বিষাক্ত উপাদান গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে খাদ্য নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। ভারতে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। তবু বাস্তবে খাদ্য উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নজরদারির ঘাটতি রয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সময়ে সময়ে ভেজাল দুধ, নকল মশলা, রাসায়নিক মেশানো ফল ও মিষ্টির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও সমস্যার মূল শিকড় এখনও অটুট।
খাদ্যদূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত রোগের কারণে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসের ফলে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। অসুস্থ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একটি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেয়। বিশেষত দরিদ্র পরিবারগুলি চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে আরও আর্থিক সংকটে পড়ে। একটি উদ্বেগজনক বিষয় হল অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি। পশুপালন ও খাদ্য উৎপাদনে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলি ধীরে ধীরে ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। খাদ্যের মাধ্যমে এই প্রতিরোধী জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলির মধ্যে একটি বলে মনে করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনও খাদ্য নিরাপত্তার উপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা এবং অনিয়মিত আবহাওয়া খাদ্যে জীবাণু ও বিষাক্ত ছত্রাকের বিস্তার বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে আফ্লাটক্সিন নামক বিষাক্ত ছত্রাক শস্য ও খাদ্যশস্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা। এক দেশ থেকে অন্য দেশে খাদ্য পরিবহণের ফলে একটি অঞ্চলের দূষণ দ্রুত বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সংকট মোকাবিলার উপায় কী? প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তাকে জনস্বাস্থ্যের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষিক্ষেত্রে নিরাপদ ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কীটনাশক ও রাসায়নিকের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা, বাজার তদারকি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আইন থাকলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। ভোক্তাদের জানতে হবে কীভাবে নিরাপদ খাদ্য নির্বাচন করতে হয়, কীভাবে ফল ও শাকসবজি পরিষ্কার করতে হয় এবং কীভাবে খাদ্য সংরক্ষণ করতে হয়। পরিবারের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাস্তার খাবারের দোকান— সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন। চতুর্থত, স্কুল পর্যায় থেকেই খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শিশুদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল হবে। পাশাপাশি খাদ্য ব্যবসায়ী, কৃষক এবং উৎপাদকদেরও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
আসলে দূষিত খাদ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। উৎপাদক, বিক্রেতা, ভোক্তা এবং প্রশাসন— সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। একটি সভ্য সমাজে মানুষের খাদ্য নিরাপদ হবে— এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। অথচ আজ সেই মৌলিক অধিকারই নানা কারণে প্রশ্নের মুখে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, খাদ্যদূষণ কোনও বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি এক নীরব মহামারি। করোনা মহামারি আমাদের শিখিয়েছে, জনস্বাস্থ্যকে অবহেলা করার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে দূষিত খাদ্যের এই অদৃশ্য বিষ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং মানবসম্পদকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে।
খাদ্য মানুষের জীবনধারণের উপকরণ, মৃত্যুর কারণ নয়। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কোনও বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। আজ বিশ্ব পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের আলোচনায় খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। কারণ নিরাপদ খাদ্য মানেই সুস্থ মানুষ, আর সুস্থ মানুষই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ।