• facebook
  • twitter
  • youtube
Sunday, 26 July, 2026

বিভক্ত তৃণমূল

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে পালাবদল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী রাজনীতির স্থিতি।

বিভক্ত তৃণমূল

TMC Baduria Panchayat Samiti Photo-SNS

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবার প্রমাণ করছে যে ক্ষমতার পালাবদল যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী রাজনীতির স্থিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস যে গভীর সংকটে পড়েছে, তা এখন আর আড়াল করার মতো নয়। বরং দলীয় ভাঙন, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং সাংসদদের সম্ভাব্য অবস্থান পরিবর্তন— সব মিলিয়ে আজ অস্তিত্বের লড়াই চালাতে হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসকে।
৫৮ জন বিধায়ককে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর আলাদা দাবি শুধু দলীয় বিভাজনের ইঙ্গিতই নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রতিফলন। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে চেষ্টা করছে, তা ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। শিবসেনা ও এনসিপির উদাহরণ সামনে রেখেই এই কৌশল এগোচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে সংসদীয় রাজনীতিকে ঘিরে। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন এবং রাজ্যসভায়
১৩ জন সাংসদের অবস্থান এখন কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। ঋতব্রত শিবিরের দাবি— লোকসভার দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ কথা যদি আংশিক সত্যও হয়, তবে তা তৃণমূলের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ, সংসদীয় উপস্থিতি হারালে একটি আঞ্চলিক দলের জাতীয় প্রভাব দ্রুত লুপ্ত হতে থাকে।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসছে। শোনা যাচ্ছে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই বিজেপির সঙ্গে কিছু তৃণমূল সাংসদের যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি ২০ জন তৃণমূল সাংসদ বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে, যদিও দল নাকি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এই অপেক্ষা ও বাছাইয়ের কৌশল বিজেপির রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই পরিচায়ক— কারণ তারা বুঝে নিয়েছে, দুর্বল প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার চেয়ে তাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে অধীনস্থ রাখাই অধিক কার্যকর।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের নেতা, কিন্তু অভিষেকের কোনও ভূমিকা তাঁরা মানতে রাজি নন। এই অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বরং দলের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়েও মতভেদের প্রতিফলন। তৃণমূলের একটি বড় অংশ মনে করছে, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার পেছনে দুর্নীতির অভিযোগ এবং নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ বড় ভূমিকা নিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাবুল সুপ্রিয়র মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন— দল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতি ও অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? এই আত্মসমালোচনার অভাবই হয়তো আজকের সংকটকে তীব্র করেছে।
তবে তৃণমূলের আরেকটি স্তম্ভ— রাজ্যসভার সাংসদরা— এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে মনে করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অংশটি এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অনুগত এবং সহজে ভাঙবে না। কিন্তু রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় অটুট বলে কিছু নেই— এই কথাটিও সমানভাবে সত্য। তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার ইতিমধ্যেই তৃণমূলের সমস্ত পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ এখন সুবিদিত। শুধু তা-ই নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই সমাজমাধ্যমে সরাসরি মুখ খুলেছেন কাকলি। তৃণমূলের সংসদীয় নেতৃত্বের প্রতি এখন অনাস্থা তৈরি হয়েছে বেশ কিছু দলীয় সাংসদের। সংসদের করিডোরে উড়ছে নানা জল্পনা।
আজ তৃণমূল কংগ্রেস একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাদের সামনে দুটি পথ— এক, আত্মসমালোচনার মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করা; দুই, ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে আরও ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। ইতিহাস বলে, যে দল নিজের ভুল স্বীকার করে সংশোধনের পথে হাঁটে, তার পুনরুত্থান সম্ভব। কিন্তু যারা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তাদের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
বাংলার রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই মুহূর্তে তৃণমূলের সিদ্ধান্তের উপর। তারা কি নিজেদের পুনর্গঠিত করে একটি কার্যকর বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারবে, নাকি ক্রমশ রাজনৈতিক প্রান্তিকতায় হারিয়ে যাবে— সেই উত্তরই আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।