ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সাম্প্রতিক মন্তব্য কেবল একটি সামরিক অবস্থানের ঘোষণা নয়, বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধনীতির একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা। ‘অপারেশন সিন্দুর ২.০’-এর সম্ভাব্য প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা আজকের অস্থির ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সতর্কতা এবং প্রস্তুতি যে এক মুহূর্তের জন্যও শিথিল হয়নি, এই বক্তব্য তারই প্রতিফলন।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের সংজ্ঞা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যুদ্ধ মানেই ছিল স্থল, নৌ ও বায়ুসীমার সংঘর্ষ। কিন্তু এখন সেই ধারণা অনেক বিস্তৃত। জেনারেল দ্বিবেদী যথার্থই বলেছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে বহুমাত্রিক— যেখানে সাইবার, মহাকাশ এবং ‘কগনিটিভ’ বা মানসিক ক্ষেত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। অর্থাৎ, শত্রুর অস্ত্রভাণ্ডার যেমন বিপজ্জনক, তেমনই বিপজ্জনক তার তথ্যযুদ্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি শুধু অস্ত্র বা প্রযুক্তি নির্ভর নয়, বরং সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠছে। সেনাপ্রধানের কথায় স্পষ্ট, তিনটি বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বা ‘সিনার্জি’ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুদ্ধে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবসময়ের গোয়েন্দা তথ্য, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ এবং শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা— এই সবকিছু একসঙ্গে কাজ না করলে সাফল্য অর্জন অসম্ভব।
‘অপারেশন সিন্দুর’-এর অভিজ্ঞতা এই দিকেই ইঙ্গিত করে। এই অভিযানের মাধ্যমে ভারত যে কৌশলগত সংযম বজায় রেখেও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্ভুল এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া দিতে সক্ষম, তা প্রমাণিত হয়েছে। এটি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং একটি পরিণত ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয়।
তবে এই পুরো আলোচনার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে আসে, তা হল ‘তথ্যযুদ্ধ’ বা ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার। জেনারেল দ্বিবেদীর মতে, যুদ্ধের চূড়ান্ত জয় নির্ভর করে মানুষের মনে, যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। এই বক্তব্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। কারণ আজকের দিনে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং জনমতের পরিসরে।
শত্রুপক্ষের ভ্রান্ত তথ্য, গুজব এবং প্রোপাগান্ডা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে দুর্বল করে দিতে পারে। তাই জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা আজকের দিনে একপ্রকার কৌশলগত অস্ত্র। যখন দেশের মানুষ তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এবং তথ্যসূত্রের ওপর বিশ্বাস রাখে, তখন সেই দেশকে দুর্বল করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের অবস্থান আশাব্যঞ্জক।
সেনাবাহিনী এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা এবং সংকটের সময়ে জাতীয় ঐক্য— এই দুটি বিষয় ভারতের শক্তির অন্যতম ভিত্তি। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে এই আস্থার গুরুত্ব যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
এছাড়া, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের ‘স্বচ্ছতা’ বা ট্র্যান্সপারেন্সি সম্পর্কেও তিনি যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা উপেক্ষা করা যায় না। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এখন প্রতিটি পদক্ষেপ শত্রুপক্ষের নজরে আসতে পারে। ফলে সৈন্য মোতায়েন থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা কৌশল— সব ক্ষেত্রেই আরও বেশি সতর্কতা এবং সূক্ষ্ম পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সুতরাং বলা যায়, জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর বক্তব্য একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। এটি শুধুমাত্র একটি সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির কথা নয়, বরং ভবিষ্যতের যুদ্ধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা প্রদান করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে ভারত যদি তার প্রতিরক্ষা কৌশলকে আরও শক্তিশালী করে, তবে যে কোনও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশ আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে— এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
Advertisement