বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে শ্রাবণের মেঘ কেটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই, বরং দিন দিন তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। গত ৫ আগস্ট তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক দেশে ফেরার ঘোষণা উপমহাদেশের ভূ-রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কি নেহাতই নিজের জন্য এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ, নাকি এটি ক্ষমতার অলিন্দে ফেরার আগে জল মাপার এক রাজনৈতিক কৌশল?
প্রথমেই আসা যাক এই ঘোষণার মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দিকটিতে। দীর্ঘ ১৫ বছর একচ্ছত্র ক্ষমতায় থাকার পর যেভাবে নাটকীয় পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, তাতে তাঁর দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। দলটির অস্তিত্ব যখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি, তখন এই ধরনের একটি ঘোষণা দলের হতাশ নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন করে অক্সিজেন জোগানোর চেষ্টা হতে পারে। একে রাজনীতিতে ‘টেস্টিং দ্য ওয়াটার’ বা পরিস্থিতি পরীক্ষা করা বলা চলে। হাসিনা দেখতে চাইছেন, তাঁর ফেরার খবরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, বিরোধী দলগুলি, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়। তবে এই কৌশল যতটা না চতুর, তার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, বর্তমান বাংলাদেশের মাটিতেও আওয়ামী লীগ বিরোধী হাওয়ার তীব্রতা কমেনি। এই অবস্থায় তাঁর আকস্মিক প্রত্যাবর্তন দল বা তাঁর নিজের জন্য রক্ষাকবচ না হয়ে উল্টো চরম বিপদের কারণ হতে পারে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার এই ইচ্ছা বা ঘোষণা কার্যত একটি আইনি গোলকধাঁধায় প্রবেশের শামিল। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই গণহত্যা, গুম এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অসংখ্য মামলা দায়ের হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি যদি কোনওভাবে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তবে তাঁকে বিমানবন্দরেই গ্রেফতার করা হবে— এটা প্রায় নিশ্চিত।
বিএনপি নেতৃত্ব শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ‘রাজনৈতিক ফাঁদ’ (ক্যালকুলেটেড রুজ) হিসেবে দেখছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কথা বলে আসলে ভেঙে পড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মাঠে নামাতে এবং নতুন করে চাঙ্গা করতে চাইছেন। বিএনপি মনে করছে, এই ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা উসকে দেওয়া। তাই সরকার ও দল হিসেবে বিএনপি হাই অ্যালার্ট বা উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে, যাতে এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কোনও পক্ষই রাজপথে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে।
বর্তমান বিএনপি সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, শেখ হাসিনা যেভাবে বা যে পথেই দেশে ফিরুন না কেন— তাঁকে দেশের প্রচলিত আইন ও আদালতের মুখোমুখি হতেই হবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধ এবং পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া গণহত্যার মামলাগুলোর রায় ও আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে সরকার সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ-সহ শীর্ষ পর্যায় থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতি কার্যত অচল এবং শেখ হাসিনাকে দেশে এনে তাঁর কৃতকর্মের আইনি সাজা নিশ্চিত করা হবে।
বিএনপি প্রথম থেকেই শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার (এক্সট্রাডিশন) পক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চালু দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং সঠিক কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমেই শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সরকারের লক্ষ্য। একই সঙ্গে, বিএনপি সরকারের শরিক ও সমমনোভাবাপন্ন অন্যান্য রাজনৈতিক দল, যেমন জামায়াতে ইসলামী এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের দ্বারা গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) আরও কঠোর সুর ব্যক্ত করেছে। তাদের মতে, হাসিনার এই ঘোষণা কেবলই একটি ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’। তারা দাবি করছে, কোনও শর্ত ছাড়াই হাসিনাকে অতি দ্রুত ফিরিয়ে এনে আদালত কর্তৃক প্রদত্ত শাস্তি কার্যকর করতে হবে।
আমাদের মনে হয়, হাসিনার এই ঘোষণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক জটিল কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিয়মের সমীকরণ। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি (এক্সট্রাডিশন ট্রিটি) রয়েছে, যা ২০১৬ সালে সংশোধন করা হয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী, কোনও পক্ষের অনুরোধে সাজাপ্রাপ্ত বা বিচারাধীন আসামিকে হস্তান্তর করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যদি না সেই অপরাধকে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু হত্যার মতো গুরুদণ্ডযোগ্য অপরাধকে এই চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনাকে ফেরত চায়, তবে ভারতের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক ধর্মসংকট তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানবাধিকার সনদের নিরিখে ভারত যেমন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা অতিথির সুরক্ষায় দায়বদ্ধ, তেমনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে। হাসিনা যদি নিজে থেকেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তবে হয়তো ভারতের ওপর থেকে এই কূটনৈতিক চাপ সাময়িকভাবে লাঘব হবে, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী সমীকরণে শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যার মূল স্তম্ভ ছিল শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, ট্রানজিট সুবিধা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে হাসিনা সরকার ভারতকে পূর্ণ সহযোগিতা করেছে। কিন্তু ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ভারতের নীতি নির্ধারণী মহলকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। ভারত কোনও নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণের এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের বন্ধু— এই নীতিতেই এখন এগোতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে। এই পরিস্থিতিতে হাসিনা যদি ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে নতুন কোনও রাজনৈতিক সংঘাতের জন্ম দেন, তবে তার আঁচ এসে পড়বে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও। ঢাকার নতুন শাসকগোষ্ঠী ভারতের বিরুদ্ধে ‘হাসিনাকে মদদ দেওয়ার’ অভিযোগ তুলতে পারে, যা দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ভারতের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রয়োজন, কোনও রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গৃহযুদ্ধ নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের ওপর। একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ইতিহাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অতি-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো এবং সাম্প্রতিক দমনপীড়নের ফলে দলটির জনভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেখ হাসিনা যদি এই মুহূর্তে দেশে ফেরেন, তবে তা দলের পুনর্গঠনে সাহায্য করার চেয়ে জনরোষকে আরও উসকে দিতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আওয়ামী লীগের টিকে থাকার জন্য এখন প্রয়োজন নেতৃত্ব পরিবর্তন, আত্মসমীক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ধীরলয়ে ফিরে আসা। কিন্তু হাসিনা যদি নিজেই আবার মঞ্চের কেন্দ্রে চলে আসেন, তবে দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হবে এবং দলটি চিরতরে একটি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ও প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাঁর প্রত্যাবর্তন আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার চেয়ে তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারে।
আমাদের মনে হয়, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা আবেগ কিংবা অনুগামীদের চাঙ্গা করার কৌশল হিসেবে সাময়িক স্বস্তি দিলেও, বাস্তব রাজনীতির রূঢ় জমিতে এটি অত্যন্ত আত্মঘাতী এক পদক্ষেপ হতে পারে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ তাঁর প্রতিকূলে।
আইনি প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক মহলের সতর্ক দৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভের মুখে তাঁর প্রত্যাবর্তন কোনও বীরোচিত প্রত্যাবর্তন হবে না, বরং তা হতে পারে এক ট্র্যাজিক পরিণতি। ভারতের মতো একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাই প্রধান অগ্রাধিকার। শেখ হাসিনার উচিত হবে আবেগের বশবর্তী না হয়ে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া এবং এমন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়া যা তাঁর নিজের, তাঁর দলের এবং সর্বোপরি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। জল মাপার এই খেলায় যদি তিনি ভুল পদক্ষেপ ফেলেন, তবে তার মাশুল শুধু তাঁকেই নয়, হয়তো পুরো অঞ্চলকেই দীর্ঘকাল ধরে দিতে হবে।




