নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু মানেই নতুন বই, নতুন খাতা, নতুন ব্যাগের উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেই বাড়ির এক কোণে জমতে থাকে পুরনো খাতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই খাতা বিক্রি হয়ে যায় পুরনো কাগজের দামে কিংবা সরাসরি চলে যায় আবর্জনার স্তূপে। অথচ সেই খাতার বহু পাতাই থেকে যায় একেবারে সাদা। আর সেই অব্যবহৃত পাতাগুলিকেই নতুন জীবনের আলোয় ফিরিয়ে আনছে কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘উৎকর্ষে আরোহণ’।
সংস্থার উদ্যোগে এখন পুরনো খাতার সাদা পাতাগুলি আর নষ্ট হচ্ছে না। বরং সেই পাতাগুলিকে নতুন করে বাঁধাই করে তৈরি করা হচ্ছে খাতা, যা পৌঁছে যাচ্ছে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের হাতে। একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই বহু শিশুর পড়াশোনার পথও সহজ হচ্ছে।
Advertisement
সংস্থার সদস্যরা বাড়ি বাড়ি এবং বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে পুরনো খাতা সংগ্রহ করছেন। পরে সেই খাতাগুলির ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত পাতা আলাদা করা হয়। যেসব পাতা সম্পূর্ণ সাদা এবং ব্যবহার হয়নি, সেগুলি যত্ন করে কেটে পাঠানো হয় বউবাজারের একটি বাঁধাই কারখানায়। সেখানে নতুন মলাট ও সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে একেবারে নতুন খাতা।
Advertisement
সংস্থার কর্ণধার অনুপম মজুমদার জানান, ‘আমরা দেখেছি, বহু খাতাতেই অর্ধেকের বেশি পাতা ব্যবহার করা হয় না। সেই পাতাগুলি ফেলে না দিয়ে যদি নতুন খাতা তৈরি করা যায়, তাহলে অনেক গরিব ছাত্রছাত্রীর কাজে লাগবে। আমাদের লক্ষ্য, খাতার অভাবে কোনও শিশুর পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়।’
এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের সাড়াও ক্রমশ বাড়ছে। বহু পরিবার এখন আর পুরনো খাতা ফেলে দিচ্ছেন না। বরং নিজেরাই সাদা পাতাগুলি আলাদা করে সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছেন। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও এই সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ছে।
এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অম্বিকা কানোয়ার্জি নামে এক ছাত্রীর অভিজ্ঞতাও। অম্বিকা জানায়, আগে তাদের বাড়িতেও পুরনো খাতা ফেলে দেওয়া হত। কিন্তু এখন তারা জানে, সেই খাতার সাদা পাতাই অন্য কোনও ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ার সহায়ক হতে পারে। তাই এখন তারা নিজেরাই খাতার সাদা পাতাগুলি আলাদা করে সংস্থার হাতে তুলে দেয়।
বউবাজারের বাঁধাই কারখানার কর্মীরাও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলাদা আনন্দ পাচ্ছেন। তাঁদের কথায়, ‘দিনভর খাতা বাঁধাইয়ের কাজ করি। কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে মনে হচ্ছে সমাজের জন্য কিছু করতে পারছি। সেই তৃপ্তি আলাদা।’
এই উদ্যোগ শুধু পুনর্ব্যবহারের উদাহরণ নয়, এটি এক গভীর সামাজিক বার্তাও বহন করছে। একদিকে কাগজের পুনর্ব্যবহার বৃক্ষরক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সাহায্য করছে, অন্যদিকে বহু দুঃস্থ শিশুর শিক্ষার অধিকারকে শক্তিশালী করছে।
অনুপম মজুমদারের আশা, আগামী দিনে এই উদ্যোগ আরও বড় আকার নেবে। তাঁর কথায়, ‘সবাই যদি একটু সচেতন হন, তাহলে আরও বহু শিশুর কাছে আমরা পৌঁছতে পারব। কারও কাছে অপ্রয়োজনীয় জিনিসই অন্য কারও জীবনে নতুন আলোর দিশা হয়ে উঠতে পারে।’
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই উদ্যোগ যেন সমাজকে নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, মানবিকতা শুধু বড় বড় কথায় নয়, ছোট ছোট কাজের মধ্যেও বেঁচে থাকে।
Advertisement



