• facebook
  • twitter
Wednesday, 13 May, 2026

তামিলনাড়ুর নতুন সমীকরণ

তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে সংখ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, অন্যদিকে তেমনি উত্থাপন করেছে একাধিক নৈতিক ও সাংবিধানিক প্রশ্ন। তামিলগা ভেত্রি কাঝাগম (টিভিকে)-এর নেতা সি জোসেফ বিজয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন— এটি নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ঘটনা। চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয়তা থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর এই দ্রুত উত্তরণ তামিল সমাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নতুন ধারা নির্দেশ করছে।

তবে এই উত্থান এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়। ১১৮ আসনের ম্যাজিক সংখ্যা থেকে ১০টি আসন কম পাওয়ার পর, টিভিকে সরকার গঠনের জন্য ভরসা করেছে কংগ্রেস, সিপিআইএম, সিপিআই, ভিসিকে এবং ভারতীয় মুসলিম লীগ ইত্যাদি একাধিক দলের উপর।

Advertisement

এই সমর্থনের ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— এই সমর্থন কতটা নীতিগত, আর কতটা রাজনৈতিক সুবিধাবাদ?

Advertisement

বিশেষ করে কংগ্রেসের ভূমিকা এখানে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী ডিএমকে-কে ছেড়ে টিভিকের পাশে দাঁড়ানো কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি তাৎক্ষণিক সুবিধা অর্জনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের দুর্বল ফলাফল, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং নেতৃত্বের সংকট এই সিদ্ধান্তকে আরও স্পষ্ট করে। অথচ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটই তামিলনাড়ুতে সবকটি আসন জিতেছিল। ফলে কংগ্রেসের এই অবস্থানকে অনেকেই দূরদর্শিতার অভাব হিসেবেই দেখছেন।

অন্যদিকে, বাম দল ও ভিসিকে-র সমর্থন কিছুটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। তারা স্থিতিশীল সরকার গঠনের যুক্তি দিয়েছে এবং একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলেছে। এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত হলেও, ডিএমকে-র সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রেক্ষিতে এটি একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাজ্যপালের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আর্লেকর সরকার গঠনের আগে ১১৮ জন বিধায়কের লিখিত সমর্থন দাবি করেছিলেন, যা সারকারিয়া কমিশন-এর সুপারিশ এবং
রামচন্দ্র প্রসাদ বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া (২০০৬) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা হওয়া উচিত বিধানসভায়, রাজভবনে নয়। ফলে এই পদক্ষেপ সাংবিধানিক সৌজন্যের সীমা লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়।

তবে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন সরকারের কার্যকারিতা। এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ডিএমকে সরকার যে উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল— শিল্পায়ন, সামাজিক ন্যায় এবং কল্যাণমূলক নীতির সমন্বয়— তা তামিলনাড়ুকে দেশের অন্যতম অগ্রগামী রাজ্যে পরিণত করেছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এখন বিজয়ের সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

একই সঙ্গে, তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁর জনপ্রিয়তা শুধুমাত্র পর্দার সাফল্যের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা ও নীতিগত স্থিরতার উপরও প্রতিষ্ঠিত। জোটসঙ্গীদের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা, নীতিগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি— এই তিনটি ক্ষেত্রেই তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হবে।

তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রে সংখ্যা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা। একটি ঝুলন্ত বিধানসভা যে কতভাবে রাজনৈতিক সমীকরণকে বদলে দিতে পারে, তারই এক জীবন্ত উদাহরণ এই ঘটনা। এখন দেখার, এই নতুন সমীকরণ কতটা স্থায়ী হয় এবং তা রাজ্যের উন্নয়নের গতিকে কতটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, ক্ষমতায় আসা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই ক্ষমতার সঠিক ও দায়িত্বশীল প্রয়োগ। বিজয় সরকারের সামনে তাই এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথ উন্মুক্ত— যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই শুধু রাজনৈতিক স্থায়িত্ব নয়, তামিলনাড়ুর অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

Advertisement