• facebook
  • twitter
Monday, 20 April, 2026

বাগবাজারে চন্দনযাত্রার আবেশ, কোলাহলের শহরে ভক্তি ও শান্তির পরশ

ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। স্বেচ্ছাসেবীরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা করেন এবং সকলের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে।

ব্যস্ত নগর কলকাতার কোলাহলের মাঝেই বাগবাজারের এক প্রাচীন প্রাঙ্গণে প্রতি বছর বৈশাখ মাসে নেমে আসে এক অন্য আবহ। এখানে গৌড়ীয় মঠে শুরু হয় শ্রীশ্রীকৃষ্ণের চন্দনযাত্রা মহোৎসব। বাইরে প্রখর গরমে নাজেহাল শহরবাসী, আর মঠের ভিতরে চন্দনের শীতল সুবাস, কীর্তনের ধ্বনি আর প্রার্থনার নিবিড়তায় তৈরি হয় এক অনন্য ভক্তিময় পরিবেশ।

এই চন্দনযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, ভক্তদের কাছে এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা। এখানে ভক্তি হয়ে ওঠে জীবনের মূল সুর, আর সেবা হয়ে ওঠে আত্মার পরম তৃপ্তি।

Advertisement

চন্দনযাত্রার ইতিহাস বহু প্রাচীন। বৈষ্ণব শাস্ত্র অনুযায়ী, সত্যযুগে পুরীর মহারাজা শ্রীইন্দ্রদ্যুম্নকে শ্রীজগন্নাথদেব তাঁর শ্রীঅঙ্গে শীতলতার জন্য অক্ষয় তৃতীয়া থেকে চন্দন লেপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরম্পরায় এই প্রথা আরও বিস্তৃত হয়। শ্রীঈশ্বর পুরী ও শ্রীমাধবেন্দ্রপুরীর মাধ্যমে এই সেবাধর্মের প্রচার ঘটে, যেখানে ভগবানের সেবা মানেই প্রেমের প্রকাশ—এই ভাবধারাই চন্দনযাত্রার মূল ভিত্তি।

Advertisement

ভক্তদের মতে, চন্দনের শীতলতা শুধু শরীরকে নয়, মনকেও শান্ত করে। মানুষের অন্তরের দুঃখ, ক্লেশ ও অশান্তি দূর করার প্রতীক হিসেবেই এই চন্দনযাত্রার গুরুত্ব রয়েছে। যখন ভক্ত নিজের হাতে চন্দন ঘষে শ্রীবিগ্রহে নিবেদন করেন, তখন সেই সেবার সঙ্গে তাঁর অন্তরের অনুভূতি মিশে যায়। এই সেবার মধ্য দিয়েই ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বাগবাজার গৌড়ীয় মঠে এই উৎসবের প্রতিটি দিন শুরু হয় মঙ্গল আরতির মাধ্যমে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের আগমন শুরু হয়। নিজের হাতে চন্দন প্রস্তুত করে শ্রীশ্রীগৌর-রাধাবিনোদানন্দ জীউ-র অঙ্গে অর্পণ করেন ভক্তরা। বিকেলে ভাগবত পাঠ, পরিক্রমা, গুরুবর্গের আরতি ও সন্ধ্যা আরতির মাধ্যমে দিনটি পূর্ণতা পায়। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে নয়টা পর্যন্ত চন্দন শৃঙ্গার দর্শনের জন্য ভক্তদের ভিড় জমে ওঠে। এই ধারাবাহিকতা টানা একুশ দিন ধরে চলে, প্রতিটি দিনই ভক্তদের জন্য নতুন অনুভূতি নিয়ে আসে।

চন্দনযাত্রা শুধু আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতিরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই একসঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। স্বেচ্ছাসেবীরা নিষ্ঠার সঙ্গে সেবা করেন এবং সকলের জন্য প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে। এই সম্মিলিত অংশগ্রহণ সমাজে ঐক্যের বার্তা দেয়।

কলকাতার দ্রুত গতির জীবনের মাঝে বাগবাজার গৌড়ীয় মঠ যেন এক শান্তির আশ্রয়। চন্দনযাত্রার সময়ে এখানে প্রবেশ করলে মনে হয় সময় যেন ধীর হয়ে গেছে। ভক্তদের অনেকেই জানান, এই উৎসবে অংশ নিয়ে তারা মানসিকভাবে শান্তি পান এবং জীবনের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করেন।

এই চন্দনযাত্রা ভক্তিকে ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে সর্বজনীন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করে। ভক্তরা যখন চন্দন অর্পণ করেন, তখন শুধু নিজের নয়, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ কামনা করেন। এই ভাবনাই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের মূল শিক্ষা—‘জীবের দয়া, নামের রুচি, বৈষ্ণব সেবা’।

Advertisement