অতনু রায়
শ’য়ে শ’য়ে মানুষ, গ্লিটজ্ আর গ্ল্যামারের মেলা। হলিউডের সবচেয়ে বড় রাত। আর সেই রাতেই এক নারী ভেঙে দিলেন এক অদৃশ্য কাচের দেওয়াল। ভাবছেন, কে? নামটা হয়ত অনেকের কাছে একটু অচেনা লাগতে পারে, কিন্তু যে কাজটা করেছেন সেটা কিন্তু চিরকাল মনে থাকবে। তিনি আওটাম ডুরাল্ড আর্কাপাও… প্রথম মহিলা এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে অস্কার জয়ের জন্য যাঁর নাম রেকর্ড বুকে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
Advertisement
রায়ান কুগ্লারের ছবি ‘সিনার্স’ যখন ১৬টা মনোনয়ন নিয়ে ইতিহাস গড়ল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে ইতিহাস গড়ছিলেন আওটাম। ২০২৬ সালের অস্কার শুধু একটা পুরস্কার নয়, একটা বার্তা। সেরা সিনেমাটোগ্রাফি বিভাগে আওটামের জয় প্রমাণ করে দিল, ক্যামেরার পেছনে শুধু পুরুষরাই বসবেন, এই ধারণাটা আর বাস্তব নয়।
Advertisement
শুধু অস্কার জয়ই নয়, গত বছরটা ছিল তাঁর জন্য একের পর এক মাইলফলক। ‘সিনার্স’ ছবির জন্যই তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা হিসেবে এই ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পান। শুধু তাই নয়, তিনি প্রথম মহিলা, যিনি বড় পর্দার জন্য আইম্যাক্স ফরম্যাটে পুরো একটা ছবি শুট করলেন!
আওটাম কিন্তু হঠাৎ করে এসে ইন্ডাস্ট্রিতে পড়েননি। শেকড়টা বলতে গেলে ফিলিপিনো আর ব্ল্যাক ক্রেওল মিলিয়ে। বাড়ি ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়াতে। ছোটবেলায় দাদু-ঠাকুমার ভ্রমণের ছবি দেখে দেখে তাঁর মধ্যে ছবি তোলার শখ জন্মায়। শুরুটা ফটোগ্রাফি দিয়েই। পরে তিনি লয়োলা ম্যারিমাউন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে আর্ট হিস্ট্রিতে পড়াশোনা শুরু করেন। ইচ্ছে ছিল আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হবেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম কোর্সে ঢোকার পর তাঁর জীবনটাই বদলে যায়। বিশেষ করে গর্ডন উইলিস, মাইকেল চ্যাপম্যান আর সবচেয়ে বেশি যাঁর কাজ আওটামকে নাড়া দেয়, তিনি হলেন, এলেন কিউরাস। সেই মহিলা সিনেমাটোগ্রাফার কিউরাস, যিনি ‘ইটারনাল সানসাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড’ শুট করেছিলেন।
পুরুষশাসিত এই ইন্ডাস্ট্রিতে, যেখানে ২০২৫ সালের সেরা ছবিগুলোর মাত্র সাত শতাংশের ক্যামেরার পেছনে ছিলেন নারী, সেখানে এলেন কিউরাসের সাফল্যই আওটামকে স্বপ্ন দেখায়। তাঁর মনে হয়, ‘আমারও হবে।’ এরপর আওটামকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট (এএফআই) থেকে সিনেমাটোগ্রাফিতে মাস্টার্স করে ফেললেন।
আওটামের শুরুর দিকের কাজ বলতে গেলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি আর মিউজিক ভিডিও। একের পর এক মিউজিক ভিডিওতে তাঁর ক্যামেরার মুন্সিয়ানা অবাক করে সবাইকে। এই সময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক মহিলা পরিচালক জিয়া কপোলার। শুরুটা ছিল কম বাজেটের ফ্যাশন শুট দিয়ে। তারপর সেই বন্ধুত্ব আর পেশাদার সম্পর্ক এগোয় ‘প্যালো অল্টো’ আর ‘দ্য লাস্ট শো-গার্ল’–এর মতো সিনেমা পর্যন্ত।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবির পর আওটাম যখন স্টুডিওর সিনেমায় পা রাখেন, তখন নজর কাড়ে তাঁর ইউনিক স্টাইল। মার্ভেল স্টুডিওজের ‘লোকি’ সিরিজের ক্যামেরার দায়িত্ব সামলান। তারপরই রায়ান কুগ্লারের হাত ধরে ‘ব্ল্যাক প্যান্থার: ওয়াকান্ডা ফরএভার’। এক অদ্ভুত আত্মীয়তা তৈরি হয়ে গেল যেন পরিচালক আর সিনেমাটোগ্রাফারের। রায়ানের সঙ্গে তাঁর বন্ডিং, বন্ধুত্ব আর আস্থাই গড়ে তুলল ‘সিনার্স’— যা আজ ইতিহাস।
কাজের পাশাপাশি আওটাম কিন্তু সংসারও সামলান। তিনি একজন মা। সিনেমার সেট আর তাঁর ঘুরতে থাকা জীবন পরিবারের জন্য কতটা কঠিন, সেটা সবাই কম-বেশি জানেন। কিন্তু আওটাম বলেন, মা হওয়ার পর তাঁর কাজের মান আরও ভালো হয়েছে। তিনি এখন প্রোজেক্ট বাছাইয়ে অনেক বেশি সিলেকটিভ, সময়মতো সব কাজ সামলাতে পারেন, আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি এখন সেটে অনেক বেশি পাওয়ারফুল। ফ্যাশনের প্রতি তাঁর টানও কিন্তু নেহাত কম নয়। অস্কার জয়ের রাতে তিনি পরেছিলেন বিখ্যাত ডিজাইনার টম ব্রাউনের ডিজাইন করা ফর্ম্যাল কন্ট্রাস্টিং আউটফিট। তাঁর স্টাইল স্টেটমেন্ট যেন, ‘ফ্যাশনেবল এবং কমফর্টেবল’!
আওটামের এই সাফল্য শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এটা এক ভোকাল স্টেটমেন্টও বটে। যাঁরা ভাবেন, ‘আমি কি পারব?’ তাঁদের জন্য আওটামের জয় যেন এক নির্বাক উত্তর। সিনেমা-ইতিহাসে যখানে মহিলা বা কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা সিনেমাটোগ্রাফারের সংখ্যাই হাতেগোনা, সেখানে তিনি প্রমাণ করলেন, নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা আজও আছে। শুধু স্বপ্ন দেখতে হবে।
এখন অপেক্ষা থাকুক আগামীর জন্য। এবার জনপ্রিয় সিরিজ ‘এক্স-ফাইলস রিবুট’-এ আবার রায়ান কুগ্লারের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চলেছেন তিনি। আর তাঁর দর্শকরা, যা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন, অপেক্ষায় থাকবেন আবার কোনো আওটাম ডুরাল্ড আর্কাপাও ম্যাজিকের!
Advertisement



