আধুনিক ভারতের সমাজতাত্ত্বিক মানচিত্রে একটি বিচিত্র ও উদ্বেগজনক বৈপরীত্য আজ অত্যন্ত প্রকট। একদিকে আমরা ঘটা করে নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সুশাসনের পাঠ দিচ্ছি, অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে বা সামাজিক স্তরে আমরা অবলীলায় সেই মানুষকে আদর্শ হিসেবে বেছে নিচ্ছি, যার হাতে অপ্রতিহত ক্ষমতা আছে— তা সে ক্ষমতার উৎস নৈতিক হোক বা অনৈতিক। সমাজবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন তুলছেন: কেন ভারতীয় সমাজে নীতির (Ethics) চেয়ে ক্ষমতা (Power) বেশি আদরণীয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত সেই ক্ষতগুলোকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন, যা আমাদের ক্রমশ ক্ষমতার উপাসক বানিয়ে তুলছে।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি উদ্ধত বা অনৈতিক হন, সমাজ তাকে ব্রাত্য করার বদলে ‘ক্যারিশম্যাটিক’ তকমা দিয়ে মাথায় তুলে রাখে। অন্যদিকে, একজন আজন্ম নীতিবান মানুষ যদি সিস্টেমের জাঁতাকলে পিষ্ট হন, তবে আমরা সহানুভূতি দেখানোর বদলে তাকেই বিদ্রূপ করি এই বলে যে, বর্তমান যুগে টিকে থাকার যোগ্যতা তার নেই। এই যে নীতিবানকে দুর্বল ভাবার মানসিকতা, এর শিকড় রয়েছে আমাদের দীর্ঘকালীন মানসিক দাসত্ব ও ক্ষমতার প্রতি এক অদ্ভুত ভীতিমিশ্রিত শ্রদ্ধায়। সমাজ যখন ক্ষমতাকে চারিত্রিক দৃঢ়তার চেয়ে বড় করে দেখে, তখন অনৈতিকতা কোনো বিচ্যুতি নয়, বরং একটি অলিখিত সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়।
ভারতের এই ক্ষমতার পূজার নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘকালীন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। বর্ণপ্রথা থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র—সবক্ষেত্রেই এ দেশে একটি কঠোর পদানুক্রমিক বা ‘হায়ারার্কিক্যাল’ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে যে, শুষ্ক নীতি বা আদর্শ কাউকে সুরক্ষা দেয় না, সুরক্ষা দেয় কেবলমাত্র ক্ষমতার ছায়াতল। মানুষ আজন্মকাল ধরে দেখে এসেছে যে আইন বা নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাই আমাদের মজ্জায় গেঁথে দিয়েছে যে, নীতি মেনে চলা হলো এক প্রকার বিলাসিতা, আর ক্ষমতা দখল করা হলো টিকে থাকার একমাত্র ধন্বন্তরি মন্ত্র।
Advertisement
আমাদের সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াই আজ এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শৈশব থেকে আমাদের অবচেতনে গেঁথে দেওয়া হয়— ‘যার লাঠি তার মোষ’। ফলে, একটি শিশু যখন বড় হয়, সে আদর্শ মানুষ হওয়ার চেয়ে ক্ষমতাশালী হওয়ার স্বপ্নে বেশি বিভোর থাকে। এই প্রবণতা কেবল রাজনীতিতে নয়, বরং আমাদের পরিবার এবং কর্পোরেট জগতেও সমানভাবে সত্য। সেখানেও মেধা বা সততার চেয়ে তোষামোদ ও ক্ষমতার দালালি অনেক বেশি ফলদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।বর্তমান সমাজে আমরা যাকে শ্রদ্ধা বা সম্মান করি, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নৈতিক নয়, বরং কৌশলগত বা ‘স্ট্র্যাটেজিক’। আমরা তাকেই সম্মান করি যে আমাদের কোনো স্বার্থসিদ্ধি করতে পারে।
Advertisement
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘এফেক্টিভ ইন্ডিভিজুয়ালিজম’। অর্থাৎ, আমাদের ভক্তি বা শ্রদ্ধা আসলে এক ধরণের বিনিয়োগ। যতক্ষণ একজন ব্যক্তি ক্ষমতার শিখরে থাকেন, ততক্ষণই তাঁর চারপাশে তোষামোদকারীর ভিড় থাকে। যে মুহূর্তে ক্ষমতা চলে যায়, সেই মুহূর্তেই সেই মানুষটি সমাজের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়েন। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের শিখিয়েছে যে ক্ষমতা না থাকলে সম্মান পাওয়া অসম্ভব।
ভারতের মতো একটি দেশে, যেখানে সরকারি পরিষেবা বা ব্যক্তিগত অধিকার পেতে গেলে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়, সেখানে ক্ষমতা কেবল দম্ভের প্রতীক নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় তাৎক্ষণিক ন্যায় পাওয়ার একটি শর্টকাট। এই মানসিকতার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, কোরাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ৯৩তম। এই সূচকটি কেবল দুর্নীতির খতিয়ান দেয় না, বরং এটি আমাদের সমাজের সেই হাহাকারকে তুলে ধরে যেখানে সাধারণ মানুষকে একটি ছোট কাজের জন্যও ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করতে হয়।
আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতাও এই ক্ষমতার পূজাকে অনেকাংশে উসকে দেয়। ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে ৫ কোটিরও বেশি মামলা ঝুলে আছে। যখন একজন সাধারণ মানুষ দেখেন যে নীতি মেনে চলে তাঁর একটি ন্যায্য কাজ উদ্ধার করতেও দশকের পর দশক সময় লেগে যেতে পারে, তখন তিনি বাধ্য হয়ে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির শরণাপন্ন হন। এই যে ব্যবস্থার শ্লথ গতি, এটাই ‘পাওয়ার ব্রোকার’দের প্রাসঙ্গিক করে তোলে। মানুষ ক্ষমতাকে ভালোবাসে না, সে আসলে ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চায় দ্রুত ন্যায় পাওয়ার জন্য। অর্থাৎ, আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র যত বেশি জটিল ও শ্লথ হবে, ক্ষমতার পূজা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
এটি একটি দুষ্টচক্রের মতো কাজ করে; ব্যবস্থা যত অচল হয়, মানুষ তত বেশি অনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে নীতির গুরুত্ব ক্রমশ ম্লান হয়ে যায় এবং ক্ষমতা হয়ে ওঠে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি।
আজকের যুগ হলো ‘ইমিডিয়েট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তির যুগ। আধুনিক প্রজন্ম আর দীর্ঘ প্রতীক্ষায় বিশ্বাসী নয়। তারা আজই সাফল্য চায়, আজই বিত্ত-বৈভব ও সামাজিক প্রতিপত্তি চায়। নীতি মেনে সাফল্য অর্জনের পথটি কণ্টকাকীর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদী, যার পরিণাম অনেক সময় অনিশ্চিত। অন্যদিকে, ক্ষমতা দেয় দ্রুত ফল এবং নিশ্চিত সুরক্ষা।
এই ভোগবাদী সংস্কৃতি আমাদের এমন এক প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়েছে যেখানে আমরা লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারি। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (ADR)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের একটি বিশাল অংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকা সত্ত্বেও তারা বারংবার জয়ী হন। সমাজ যখন দেখে যে অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার দাপটে ব্যক্তি জয়ী হচ্ছেন এবং সমাজ তাকেই কুর্নিশ করছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে ‘নীতির চেয়ে ক্ষমতা বড়’— এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়।
তবে এই সংকটের অর্থ কি এই যে ভারতীয় সমাজ সম্পূর্ণ নীতিহীন হয়ে পড়েছে? বাস্তব চিত্রটি সম্ভবত আরও জটিল। আমাদের সমাজ আদতে অনৈতিক নয়, বরং এটি একটি ‘সারভাইভাল মোড’-এ চলা সমাজ। রাস্তার মোড়ে যখন একজন অসহায় মানুষকে কেউ সাহায্য করে, তখন সেখানে নীতি বেঁচে থাকে। কিন্তু যখনই বৃহত্তর স্বার্থ বা ব্যবস্থার প্রশ্ন আসে, তখন মানুষ ভয় পায়। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় ক্ষমতার দাসত্ব।আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি যেখানে নীতি মেনে চলা মানেই হলো পিছিয়ে পড়া। অর্থনৈতিক বৈষম্যও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে যখন দেশের সিংহভাগ সম্পদ কুক্ষিগত থাকে, তখন নিচুতলার মানুষ টিকে থাকার তাগিদে সেই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষদের তোষামোদ করতে বাধ্য হয়।
বাস্তবতা হল, ভারতের এই ‘পাওয়ার কালচার’ কোনও নৈতিক স্খলন নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া সিস্টেমের অনিবার্য পরিণতি। যতক্ষণ প্রশাসন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবে এবং বিচার প্রক্রিয়া অন্তহীন অপেক্ষায় বন্দি থাকবে, ততক্ষণ নীতিকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার দালালিই এ দেশের শ্রেষ্ঠ ’জীবনকৌশল’ হিসেবে টিকে থাকবে। সদিচ্ছা বা আদর্শের বুলি দিয়ে এই শিকড় উপড়ানো সম্ভব নয়। সমাজ তখনই নীতিকে গুরুত্ব দেবে যখন নীতি মেনে চলাটা ক্ষমতার চেয়ে বেশি লাভজনক হবে। নচেৎ, ‘ক্ষমতাই শেষ কথা’— এই রূঢ় সত্যটিই আগামী দিনে ভারতের একমাত্র সামাজিক সংবিধানে পরিণত হতে চলেছে কি?
Advertisement



