• facebook
  • twitter
Thursday, 12 March, 2026

গ্যাস সরবরাহ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জনমনে যেন কোনোভাবেই সংকটের আতঙ্ক তৈরি না হয়। জ্বালানি বাজারে তথ্যের অসমতা খুবই সাধারণ বিষয়।

নিজস্ব চিত্র

পশ্চিম এশিয়ায় সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু পরিস্থিতিকে ঠান্ডা মাথায় বিচার করলে দেখা যায়, অন্তত এই মুহূর্তে প্রকৃত অর্থে কোনও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়নি। বরং বড় প্রশ্ন হল, এই পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে অযথা আতঙ্ক তৈরি না করে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

বাজারের মনস্তত্ত্ব অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারের আচরণে এমনই একটি ইঙ্গিত দেখা গিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই যুদ্ধকে স্বল্পমেয়াদি অভিযান বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হতে পারে। যদি সংঘাত সত্যিই দ্রুত শেষ হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসবে। তখন দামও স্বাভাবিক হবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধাক্কা লাগার আশঙ্কা কমবে।

Advertisement

এখানে আরেকটি বিষয়ও বাজারকে আশাবাদী করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং রুশ তেল ও গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। তাই যদি তাদের সরবরাহ আংশিকভাবে হলেও বিশ্ববাজারে ফিরে আসে, তাহলে জ্বালানি সরবরাহের চাপ অনেকটাই কমে যেতে পারে।

Advertisement

তবে ভারতের ক্ষেত্রে তেল নয়, এই মুহূর্তে বড় উদ্বেগের বিষয় প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের মোট এলপিজির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই আমদানির উপর নির্ভরশীল। এর বড় অংশ আসে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি থেকে, বিশেষ করে কাতার থেকে। যুদ্ধাবস্থায় জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে সেই সরবরাহ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। তেলের মতো গ্যাস দীর্ঘদিন মজুত করে রাখা যায় না, কারণ এটিকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে দেশে গ্যাসের মজুত সাধারণত সীমিত সময়ের জন্যই থাকে।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি গ্যাস বিতরণে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রান্নার গ্যাস ও পরিবহণে ব্যবহৃত সিএনজি সরবরাহকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার পরের ধাপে রয়েছে সার শিল্প এবং অন্যান্য শিল্পক্ষেত্র। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত বলেই মনে হয়। কারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যাতে বিঘ্নিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তবে এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয়ও বিবেচনা করা দরকার। ‘গৃহস্থালি’ ও ‘বাণিজ্যিক’ ব্যবহারের বিভাজন অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। দেশের অসংখ্য শ্রমিক, ট্রাকচালক কিংবা দৈনিক মজুরের খাবার রান্না হয় ছোট রেস্তোরাঁ, ধাবা বা কারখানার ক্যান্টিনে। এই রান্নাঘরগুলোকে কেবল বাণিজ্যিক বলে দেখলে বাস্তব চাহিদার একটি বড় অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। তাই গ্যাস বিতরণের ক্ষেত্রে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের মধ্যে অতিরিক্ত বৈষম্য তৈরি হলে তা উল্টো সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, জনমনে যেন কোনোভাবেই সংকটের আতঙ্ক তৈরি না হয়। জ্বালানি বাজারে তথ্যের অসমতা খুবই সাধারণ বিষয়। সরবরাহকারী ও সাধারণ ভোক্তার কাছে তথ্য সমানভাবে পৌঁছয় না। এই ফাঁক থেকেই অনেক সময় কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি বা অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির ঘটনা ঘটে। তাই সরকারের দায়িত্ব হল স্বচ্ছ ও নিয়মিত তথ্য দিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষকে আশ্বস্ত করা।

এই পরিস্থিতি আরেকটি শিক্ষাও দেয়— জ্বালানি ব্যবহারে সংযমের গুরুত্ব। সাধারণ মানুষ যদি অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমায়, তাহলে সাময়িক চাপ অনেকটাই সামলে নেওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে ইন্ডাকশন বা মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করার মতো ছোট উদ্যোগও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য সবচেয়ে জরুরি হল আমদানি-নির্ভরতা কমানো। দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ জৈব বর্জ্য রয়েছে, যা থেকে বিপুল পরিমাণ বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে গ্যাস আমদানির উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বায়োগ্যাস উৎপাদনের উপজাত কম্পোস্ট সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়, যা রাসায়নিক সারের বিকল্প হতে পারে।

অতএব বর্তমান পরিস্থিতি আতঙ্কের নয়, বরং দূরদর্শী পরিকল্পনার পরীক্ষা। স্বল্পমেয়াদে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির প্রসার— এই দুই পথেই ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

Advertisement