• facebook
  • twitter
Saturday, 7 March, 2026

নেপালে এগিয়ে বলেন্দ্র শাহর দল, বিশ্বের প্রথম ‘র্যা পার প্রধানমন্ত্রী’

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী অন্তত ১০৬টি আসনে এগিয়ে রয়েছে দলটি

নেপালের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। প্রাথমিক ভোটগণনার প্রবণতা অনুযায়ী বেশ কয়েকটি আসনে এগিয়ে রয়েছে রাষ্ট্ৰীয় স্বতন্ত্র পার্টি  (আরএসপি)। আর এই দলের অন্যতম মুখ ৩৫ বছরের তরুণ নেতা বলেন্দ্র শাহ। যিনি একসময় নেপালের জনপ্রিয় র‍্যাপ শিল্পী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে—বিশ্ব কি পেতে চলেছে প্রথম ‘র‍্যাপার প্রধানমন্ত্রী’?

এই প্রতিবেদন লেখার সময় অনুযায়ী, প্রাথমিক ভোটগণনার প্রবণতা অনুসারে দেশের সাতটি প্রদেশের প্রায় সব জায়গাতেই আরএসপি প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী অন্তত ১০৬টি আসনে এগিয়ে রয়েছে দলটি। ঝাপা–৫ আসনে আরএসপির প্রার্থী বলেন্দ্র শাহ এগিয়ে আছেন। কে পি শর্মা ওলিকে পিছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন। নেপালের সংবাদ মাধ্যম সূত্রে খবর, শাহ পেয়েছেন ১০ হাজার ৪৬৬ ভোট। অন্যদিকে ওলি পেয়েছেন ২ হাজার ২০৫ ভোট।

Advertisement

কাঠমাণ্ড–১ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন রঞ্জু নেউপানে । তিনি মোট ১৫,৪৫৫টি ভোট পেয়েছেন এবং তাঁর জয়ের ব্যবধান ৯,০৯১ ভোট। কাঠমাণ্ডু–৬ আসনে জয়ী হয়েছেন শিশির খানাল । অন্যদিকে কাঠমাণ্ডু–৮ আসনে জয়ী হয়েছেন বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ । তিনি মোট ২৪,৫৯২টি ভোট পেয়েছেন এবং ২১,৩৭৫ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। কাঠমান্ডুর এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে জয়ের ফলে নেপালের রাজনীতিতে আরএসপির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Advertisement

নেপালের তরুণ প্রজন্মের কাছে বলেন্দ্র শাহ এখন পরিবর্তনের প্রতীক। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ থেকেই তাঁর উত্থান। তিনি প্রথমে কাঠমাণ্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়েই এবার জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। মেয়র হিসেবে প্রায় তিন বছর কাজ করার পর তিনি সরাসরি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন এবং প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে অন্যতম শক্তিশালী মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন।

১৯৯০ সালের ২৭ এপ্রিল কাঠমাণ্ডুর নারাদেবী এলাকায় জন্ম বলেন্দ্র শাহের। তাঁর পরিবার মূলত মৈথিলি সম্প্রদায়ের। বাবা রাম নারায়ণ শাহ ছিলেন একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। পরিবারের শিকড় ছিল নেপালের মহোত্তরী জেলায়, তবে চাকরির সূত্রে তাঁর পরিবার পরে কাঠমাণ্ডুতে বসবাস শুরু করে।

শিক্ষাজীবনেও তিনি বেশ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। কাঠমাণ্ডুর ভিএস নিকেতন স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি হিমালয়ান হোয়াইটহাউস ইন্টারন্যাশনাল কলেজ  থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কর্ণাটকের বিশ্বেশ্বরায়া টেকনোলজিকাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। নগর পরিকল্পনা ও পরিকাঠামো সংক্রান্ত এই শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা কাঠমাণ্ডুর মেয়র হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগে বলেন্দ্র শাহ নেপালের সংগীতজগতে পরিচিত মুখ ছিলেন। ২০১৩ সালে জনপ্রিয় র‍্যাপ প্রতিযোগিতা ‘র বার্জ’ জিতে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন। তাঁর গানগুলিতে বারবার উঠে এসেছে দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তাঁর জনপ্রিয় গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে এক কোটিরও বেশি মানুষ দেখেছেন। সেই গানে তিনি বলেছিলেন—‘সরকারকে সত্য কথা বলতেই হবে, সত্য বলা অপরাধ নয়।‘ এই প্রতিবাদী সুরই তাঁকে তরুণদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয় করে তোলে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে অনেকেই বলেন্দ্র শাহকে নেপালের জেন জি রাজনীতির মুখ হিসেবে দেখছেন। কয়েক মাস আগে তীব্র তরুণ বিক্ষোভের মুখে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হলে সেই সময় সমাজ মাধ্যমে বলেন্দ্র তরুণদের উদ্দেশে লেখেন—দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এখন নতুন প্রজন্মের হাতেই তুলে নিতে হবে।

গত বছরের ডিসেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখ হন। নির্বাচনী প্রচারে তাঁর দল অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বিদেশমুখী শ্রম অভিবাসন কমানোর উপর জোর দিয়েছে। ইস্তেহারে ১২ লক্ষ নতুন চাকরি তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

হিমালয়ের কোল ঘেঁষা এই দেশে ১৬৫টি আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হচ্ছে। ২০১৫ সালের নতুন সংবিধান অনুযায়ী নেপালে একটি মিশ্র নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এই ব্যবস্থায় দু’টি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হল সরাসরি নির্বাচন, যাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ (এফপিটিপি)। এই পদ্ধতিতে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই নির্ধারিত আসনে বিজয়ী হন। দ্বিতীয়টি হল পরোক্ষ নির্বাচন বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি (পিআর)। এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের ভিত্তিতে দল তাদের মনোনীত প্রার্থীদের সংসদের ‘হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস’-এ সদস্যপদ প্রদান করে।

মোট ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৬৫টি আসন নির্বাচিত হয় এফপিটিপি পদ্ধতিতে, বাকি ১১০টি আসন পিআর পদ্ধতিতে। এফপিটিপির জন্য নির্বাচনে অংশ নেন ৩,৪০৬ জন প্রার্থী, আর পিআরের জন্য ছিল ৩,১৩৫ জন প্রার্থী। সংবিধান প্রণেতারা এই দুই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হিসেবে বলেছেন, এটি পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জন্য আনুপাতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

এই মিশ্র ব্যবস্থার কারণে কোনও একটি দল এককভাবে সহজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না এবং সাধারণত জোট সরকারের সম্ভাবনা থাকে। তবে প্রাথমিক ভোট গণনার ফলাফল অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা বলেন্দ্র শাহর দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রাথমিক ভোটের প্রবণতা যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে নেপালের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। একসময় র‍্যাপ গানের মাধ্যমে রাজনীতিকে প্রশ্ন করা সেই তরুণই হয়তো খুব শিগগিরই হিমালয়ের দেশের নেতৃত্বের আসনে বসবেন।

 

 

Advertisement