• facebook
  • twitter
Wednesday, 11 February, 2026

বিষের রাজনীতি

ধর্মনিরপেক্ষতা আজ সংবিধানের পাতায় বন্দি হয়ে পড়েছে। পাঠ্যপুস্তক, বক্তৃতা আর আদালতের রায়ে তার উপস্থিতি থাকলেও, রাস্তায়-ঘাটে, দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে তার চর্চা ক্রমশ দুর্বল।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

একটি ছবি হাজার কথা বলে, এই কথাটি আজ আর শুধু আলোকচিত্রের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজমাধ্যমের একটি পোস্ট, এমনকি মুছে ফেলা পোস্টও, নিজের মতো করে বহু অর্থ বহন করে চলে। আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এমনই এক ঘটনার সাক্ষী রইল দেশ। শাসক দল বিজেপির একটি পোস্ট, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর একটি ভিডিওর স্ক্রিনশট ছিল, তাতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে দেখা যাচ্ছিল দুই মুসলিমের ছবির দিকে বন্দুক তাক করে থাকতে। পোস্টটি পরে সরিয়ে নেওয়া হলেও তার বিষক্রিয়া মিলিয়ে যায়নি। বরং নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, সেই বিষ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই বাড়ছে।
কারণ ধর্মীয় মেরুকরণ ও সংখ্যালঘুদের দানবায়ন বিজেপির পরীক্ষিত ও বহুবার ব্যবহৃত নির্বাচনী কৌশল।

আসামের মতো রাজ্যে, যেখানে ‘অনুপ্রবেশ’ প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে জটিল ও বিতর্কিত— এই কৌশল যে শাসক দলের পক্ষে রাজনৈতিক ফসল তুলতে সহায়ক হবে, তা বুঝতে বিশেষ বুদ্ধির প্রয়োজন নেই। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তাই একদিকে প্রশাসনিক প্রধান, অন্যদিকে বিভাজনের প্রধান মুখ— এই দ্বৈত ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাঁর কথাবার্তায় এক ধরনের দ্বিমুখিতা স্পষ্ট।

Advertisement

একদিকে তিনি বারবার ‘মিয়াঁ’ শব্দটি ব্যবহার করে বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করেছেন, যে শব্দটি নিজেই একটি অবমাননাকর ও বিদ্বেষমূলক পরিচয়চিহ্নে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ তুলে প্রধান বিরোধী শক্তির ভাবমূর্তি কলুষিত করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। এই ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক বিতর্কের সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে একেবারে দেশদ্রোহিতার ইঙ্গিত বহন করে, যার উদ্দেশ্য একটাই– যুক্তির বদলে আতঙ্ক তৈরি করা।

Advertisement

এই আক্রমণাত্মক ভাষা ও আচরণ বিজেপির আদর্শগত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, তা নিছক আদর্শগত নয়, পুরোদস্তুর কৌশলগত। জনজীবনের প্রকৃত সমস্যা— বেকারত্ব, দারিদ্র্য, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবস্থা— এসব থেকে নজর ঘোরাতেই সংখ্যালঘু বিদ্বেষকে সামনে আনা হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আবেগে উসকানি দিয়ে শাসনের ব্যর্থতাকে আড়াল করাই এই রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

এখানেই আসে আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন। একজন সাংবিধানিক পদে থাকা মুখ্যমন্ত্রী কি এভাবে প্রকাশ্যে ঘৃণা ভাষণ দিতে পারেন? হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিকবার ‘মিয়াঁ’দের প্রতা হেনস্থা ও নির্যাতনের কথা গর্বের সঙ্গে বলেছেন। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে ‘মিয়াঁ’দের রিকশায় উঠলে তাদের কম ভাড়া দেওয়া উচিত। সংখ্যালঘু নাগরিকদের প্রতি এই ধরনের বক্তব্য শুধু অমানবিক নয়, সাংবিধানিক নীতিরও সরাসরি লঙ্ঘন। আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান— এই মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় এমন মন্তব্য।
তবু প্রশ্ন উঠছে, এই সবের পরেও কেন বারবার সফল হচ্ছে এই রাজনীতি? উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু বিজেপির শক্তি নয়, বিরোধীদের দুর্বলতাকেও সামনে আনতে হবে। বিজেপির নির্বাচনী উত্থান যে কেবল হিন্দুত্ববাদী আদর্শের জনসমর্থনের ফল, তা আংশিক সত্য। কিন্তু সমানভাবে সত্য এই যে, ভারতের বিরোধী শক্তিগুলি এখনও পর্যন্ত রাজনীতি ও আদর্শ— দুই ক্ষেত্রেই যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতা আজ সংবিধানের পাতায় বন্দি হয়ে পড়েছে। পাঠ্যপুস্তক, বক্তৃতা আর আদালতের রায়ে তার উপস্থিতি থাকলেও, রাস্তায়-ঘাটে, দৈনন্দিন নাগরিক জীবনে তার চর্চা ক্রমশ দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে শুধু বিজেপির সমালোচনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন করে জনসমক্ষে প্রত্যাবর্তন— যেখানে সংবিধানের অন্তর্ভুক্তি ও সমতার বোধ সাধারণ মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।

এই লড়াই শুধু একটি নির্বাচনের নয়। এটি ভারতের প্রজাতান্ত্রিক ভবিষ্যতের লড়াই। ঘৃণার রাজনীতির বিপরীতে সংবিধানের রাজনীতি— এই দ্বন্দ্বে কোন পক্ষ জিতবে, তা ঠিক করবে আজকের নাগরিক সমাজের ভূমিকা। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; নীরবতা শেষ পর্যন্ত বিষের পক্ষেই।

Advertisement