• facebook
  • twitter
Thursday, 12 February, 2026

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে ভারত: চিকিৎসা, গবেষণা ও মানবিক সংহতির যৌথ লড়াই

স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, মুখগহ্বর ক্যান্সারের মতো রোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ ও কম ব্যয়বহুল।

উজ্জ্বলকুমার দত্ত

ক্যা ন্সার আজ আর নিছক একটি রোগের নাম নয়— এ এক গভীর সামাজিক অভিঘাত যা নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে পরিবারে, অর্থনীতিতে ও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কাঠামোতে। ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজ্য, প্রতিটি জেলা, এমনকি প্রতিটি গ্রাম আজ এই মরণব্যাধির ছায়ায় কমবেশি আক্রান্ত। একদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতি, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অসহায়তা— এই দ্বন্দ্বই ক্যান্সার-বাস্তবতার মূল চিত্র। পরিসংখ্যান বলছে যে ভারতে প্রতিবছর লক্ষ-লক্ষ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং একটি বড় অংশ সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ এই মৃত্যুর অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য— যদি থাকে সচেতনতা, প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা।

Advertisement

ভারতীয় সমাজে ক্যান্সার আজও ভয় ও গোপনতার রোগ। বহু পরিবার এই রোগের নাম উচ্চারণ করতেই ভয় পায়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে যে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব, তা অবহেলার কারণে পৌঁছে যায় চূড়ান্ত স্তরে। এই ভয় কেবল মানসিক নয়— এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চিকিৎসার ব্যয়, বড় শহরে দৌড়ঝাঁপ এবং সর্বস্বান্ত হওয়ার আতঙ্ক। দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই বা বেঙ্গালুরু— এই মহানগরগুলির নামের সঙ্গে আজ ক্যান্সার চিকিৎসার আশাও জড়িয়ে আছে, কিন্তু সেই আশার মূল্য এতটাই বেশি যে গ্রাম বা ছোট শহরের মানুষ সেখানে পৌঁছতেই পারেন না। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠে আসে— ক্যান্সার কি শুধুই ধনীদের রোগ, নাকি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবার জন্য সমান চিকিৎসা নিশ্চিত করা?

Advertisement

ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় ঘাটতি আজও প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও স্ক্রিনিং ব্যবস্থার অভাব। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, মুখগহ্বর ক্যান্সারের মতো রোগগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ ও কম ব্যয়বহুল। অথচ গ্রামাঞ্চলে বা দরিদ্র শহরতলিতে নিয়মিত স্ক্রিনিং সেন্টার প্রায় নেই বললেই চলে। স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং সামাজিক কুসংস্কার— সব মিলিয়ে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। এর ফল ভোগ করে পরিবার এবং তার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের উৎপাদনশীল মানবসম্পদ।

চিকিৎসা অবকাঠামোর কথায় এলে চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। দেশে রেডিওথেরাপি মেশিন, লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর, PET-CT স্ক্যানারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দক্ষ অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, অনকোলজি নার্স—সব ক্ষেত্রেই রয়েছে তীব্র ঘাটতি। বহু সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি যে চিকিৎসক চাইলেও প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেন না। বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে প্রযুক্তি থাকলেও চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই বৈষম্য ক্যান্সারকে একটি শ্রেণিভিত্তিক রোগে পরিণত করছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে গভীরভাবে লজ্জাজনক।

এই পরিস্থিতিতে আশার আলো জ্বালায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার ন্যাশনাল মেডিক্যাল রিসার্চ রেডিওলজি সেন্টারের গবেষণায় তৈরি পরীক্ষামূলক ক্যানসার ভ্যাকসিন ‘এন্টারোমিক্স’ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। mRNA ও ভাইরাল-ভেক্টর প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি এই ভ্যাকসিন প্রাণীদেহে টিউমারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে, রোগের গতি শ্লথ করেছে এবং বেঁচে থাকার সময় বাড়িয়েছে। যদিও এটি এখনও প্রাক-ক্লিনিক্যাল স্তরে এবং মানবদেহে প্রয়োগের আগে দীর্ঘ পথ বাকি, তবু এই গবেষণা প্রমাণ করে— ক্যান্সার অজেয় নয়। বিজ্ঞান এগোচ্ছে এবং সেই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলাতে হবে আমাদের নীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও।

তবে বিজ্ঞান যতই এগোক, চিকিৎসা যদি মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তবে সেই অগ্রগতি অর্থহীন। এই প্রসঙ্গে বিকল্প চিকিৎসা— বিশেষ করে হোমিওপ্যাথি— নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বহু মানুষ মূল চিকিৎসা পদ্ধতি এড়িয়ে শুধুমাত্র বিকল্প চিকিৎসার উপর নির্ভর করেন, যা অনেক ক্ষেত্রে রোগকে আরও জটিল করে তোলে। বাস্তবতা হল, আজ পর্যন্ত হোমিওপ্যাথিকে এককভাবে ক্যান্সার নিরাময়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। তবে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্থিতি রক্ষা ও সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার হতে পারে— কিন্তু তা অবশ্যই অনকোলজিস্টের পরামর্শে, মূল চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে। ক্যান্সার চিকিৎসায় ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত আশ্বাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই রোগীর প্রতি প্রকৃত মানবিকতা।

ক্যান্সার চিকিৎসার আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম অ্যাপ্রোচ। সার্জন, মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, প্যাথোলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট—এই সমন্বয় ছাড়া আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা অসম্পূর্ণ। উন্নত দেশগুলিতে ‘টিউমার বোর্ড’ বাধ্যতামূলক হলেও ভারতে এখনও তা সর্বত্র চালু হয়নি। এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে চিকিৎসার মান যেমন বাড়বে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় খরচও কমবে।

ভারতের প্রেক্ষাপটে একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো IGIMS (ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস), পাটনা। বহু অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও সমাজকর্মীর অভিজ্ঞতা বলছে যে বিহার ও ঝাড়খণ্ডের ক্যান্সার রোগীদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি আজ এক নির্ভরতার নাম। এখানে ক্যান্সার সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ডা. দিনেশ কুমার সিনহা ও তাঁর টিমের অবদান— যাঁরা বছরের পর বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে রোগীদের চিকিৎসা করে সুস্থ করে ঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের মাধ্যমে এখানে বিনামূল্যে বা অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসা সম্ভব, যা বহু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ।

বড় শহরের নামী হাসপাতালের পিছনে না ছুটে, ভয় ও আতঙ্কে সর্বস্বান্ত না হয়ে, ধৈর্য ও আস্থার সঙ্গে পাটনাতেই চিকিৎসা নিয়ে বহু রোগী আজ ক্যান্সার জয় করছেন— এই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। IGIMS-এর পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে সরকারি হাসপাতালও চাইলে মহানগরের বেসরকারি হাসপাতালের সমতুল্য হতে পারে। এখানে রোগীকে আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নয়— মানুষ হিসেবে দেখা হয় যা চিকিৎসার সবচেয়ে বড় শক্তি।

তবু এই কয়েকটি উদাহরণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় স্তরে আর্থিক সুরক্ষা। ক্যান্সার চিকিৎসা করতে গিয়ে আজও বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিশেষ ‘ক্যান্সার ফান্ড’, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বিমা, ওষুধের উপর কর ও শুল্ক হ্রাস— এই সবকিছু এখন সময়ের দাবি। ওষুধ কোম্পানিগুলির লাভের একটি অংশ গবেষণায় বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করা গেলে দেশীয় গবেষণাও শক্তিশালী হবে।

ক্যান্সারকে হারানো সম্ভব— এই বিশ্বাস অলীক নয়। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, গবেষক, সমাজকর্মী, ওষুধ শিল্প এবং সাধারণ মানুষ— সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ছাড়া এই লড়াই জেতা যাবে না। আজ যাঁরা ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছেন, যাঁরা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন— তাঁদের সাহস ও যন্ত্রণার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের অঙ্গীকার করতে হবে যে ক্যান্সারকে ভয় নয়, বিজ্ঞান ও মানবিকতায় মোকাবিলা করতে হবে। কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে জীবনের পক্ষেই যুদ্ধ।

Advertisement