• facebook
  • twitter
Friday, 30 January, 2026

ইরানের সঙ্কট স্পর্শ করবে ভারতকে

আজ ইরানকে অস্তিত্বের সংকটে দাঁড় করিয়েছে; এবং সেই সংকটের ঢেউ ভারতকেও স্পর্শ করবে—দিল্লি যতই নীরব থাকুক না কেন।

সুদীপ ঘোষ

ইরানের আধুনিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জানুয়ারি যে অস্বস্তিকর এক ‘সীমান্তকাল’ হয়ে উঠছে, তার ইঙ্গিত মিলছে দু’টি দৃশ্যপট থেকে— একদিকে তেহরানের ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার, অন্যদিকে উপসাগরীয় জলসীমার দিকে অগ্রসরমান মার্কিন নৌবহর। নানা আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হুসেইন আলি খামেনেই তেহরানের একটি বিশেষ নিরাপদ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে সরে গিয়েছেন এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক যোগাযোগের ভার দেওয়া হয়েছে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মাসুদ খামেনেইকে। সত্যতা নিয়ে সরকারি স্তরে অস্বীকার থাকলেও, খবরটি যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ— এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কারণ ইসলামিক রিপাবলিকের রাজনৈতিক কাঠামোয় ‘সর্বোচ্চ নেতা’ কেবল রাষ্ট্রপ্রধান নন; তিনি ক্ষমতার প্রতীক, শাসনের নৈতিক মুখ, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি জনসমক্ষে কম দৃশ্যমান হয়, রাষ্ট্র-জীবনে গুজব, সন্দেহ ও নিরাপত্তা-চিন্তা অনিবার্যভাবে ফুলে ওঠে।

Advertisement

এই বাঙ্কার-সংবাদকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল। তার পেছনে রয়েছে মার্কিন ‘ফোর্স প্রজেকশন’— উপসাগরীয় অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের সেই পুরনো ব্যাকরণ, যা কূটনীতিকে কথার বদলে জাহাজ, বিমান ও স্যাটেলাইটের ভাষায় অনুবাদ করে। একাধিক রিপোর্টে উঠে এসেছে, মার্কিন নৌবাহিনীর সুপারক্যারিয়ার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও তার ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পুনর্নির্দেশ করা হয়েছে। এই ধরনের মোতায়েন সাধারণত “শুধু সতর্কবার্তা” বলে শুরু হয়, কিন্তু অঞ্চল জানে—সতর্কবার্তা কখনও কখনও যুদ্ধেরই প্রথম বাক্য। উপসাগরে প্রতিটি জাহাজ-চলাচল তাই কেবল সামরিক প্রস্তুতি নয়; এটি নীতি, সংকেত এবং দরকষাকষির দৃশ্যমান ভাষা।

Advertisement

ইরানের আতঙ্কের আরও একটি মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে— গত বছরের জুনে ১২ দিনের ইরান-ইজরায়েল সংঘাত। সে সময় বহু বিশ্লেষণ, স্যাটেলাইট মূল্যায়ন ও থিঙ্ক-ট্যাংক রিপোর্টে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাতের মাত্রা নিয়ে আলোচনা হয়। যুদ্ধের স্মৃতি শুধু ধ্বংসের নয়— রাষ্ট্রের অভেদ্য নিরাপত্তা মিথেরও ক্ষয়। ফলে আজ যখন মার্কিন নৌবহর আবার এগোয়, তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে ‘শীর্ষ নেতৃত্ব লক্ষ্য করে আঘাত’— এই আশঙ্কা আর নিছক কল্পনা থাকে না; তা নীতিনির্ধারণের ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু ইরানের এই বাইরের যুদ্ধ ভয়, ভেতরের বাস্তবতা ছাড়া অপূর্ণ। দেশটিতে অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, এবং সরকারের কঠোর দমননীতির ফলে জনক্ষোভ জমাট বাঁধছে— এ কথা বহু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়। মৃত্যুসংখ্যা বা গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি আছে— সরকারি তথ্য, বিরোধী মাধ্যম এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের হিসাব এক নয়। তবু মূল সত্যটি স্পষ্ট: রাষ্ট্র যখন নিজের জনগণকে শত্রু বলে দেখতে শুরু করে, তখন পররাষ্ট্রনীতি আর কেবল সীমান্তরক্ষার নীতি থাকে না— তা হয়ে ওঠে শাসন টিকিয়ে রাখার কৌশল। বাইরের শত্রু তখন ভেতরের দমননীতির বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। আর এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন হয় দ্বিগুণ পিষ্ট—একদিকে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় দমন ও নজরদারি।

এই অবস্থায় ক্ষমতার ‘পারিবারিকীকরণ’ প্রসঙ্গটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদি সত্যিই মাসুদ খামেনেইকে দৈনন্দিন প্রশাসনিক যোগাযোগের দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা দুইভাবে পড়া যায়। এক, এটি জরুরি অবস্থায় শাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা— রাষ্ট্র যেন ‘নেতাবিহীন’ না দেখায়। দুই, এটি নীরব ‘উত্তরাধিকার অনুশীলন’—যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে পরিবার-নির্ভর হয়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো— রাষ্ট্রপতি, সংসদ, মন্ত্রণালয়— ক্রমে প্রান্তে সরে যায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত বেশি নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক হয়, তত বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃত্ত ছোট হয়; আর বৃত্ত ছোট হলে তা অবধারিতভাবে পরিবার, আস্থাভাজন গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে আটকে পড়ে। ইরানের ক্ষেত্রে আইআরজিসি (বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী) সেই নিরাপত্তা কাঠামোর কেন্দ্রে থাকা এক অতিকায় রাষ্ট্রশক্তি— যার উপস্থিতি রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রায়ই নির্ধারণ করে।

এই সবের মাঝখানে ভারতকে বসে থাকতে হয় এক অস্বস্তিকর বাস্তবতায়। মধ্যপ্রাচ্য ভারতের কাছে শুধু “বিদেশ” নয়— জ্বালানি, প্রবাসী শ্রমবাজার, সমুদ্রপথ, এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সরাসরি সংযোগ। তাই তেহরানের স্থিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতা— দুইয়েরই প্রভাব দিল্লির অর্থনীতি ও কূটনীতিতে পড়ে। কিন্তু গত এক দশকে ভারতের বিদেশনীতি যে মাত্রায় ইমেজ-নির্ভর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে—‘শো-ডিপ্লোম্যাসি’, স্লোগান-ভিত্তিক কূটনীতি, এবং ‘কাউকে না চটে’ যাওয়ার অতি-সাবধানী ভঙ্গি—তা অনেক সময় ভারসাম্যকে নীতিতে নয়, পরিস্থিতিতে ভাসিয়ে দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল অক্ষের দিকে ঝোঁক বাড়লে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ঐতিহ্যগত বাস্তববাদী খোলা দরজা সংকুচিত হয়— যার খেসারত শেষ পর্যন্ত দেয় সাধারণ নাগরিক: জ্বালানি দামের চাপ, রুট-রিস্ক, বীমা-খরচ, বাজারের অনিশ্চয়তা।

ইরানকে সম্পূর্ণ কোণঠাসা করলে অঞ্চল শান্ত হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং হরমুজ প্রণালী ও আশপাশের রুটে ঝুঁকি বাড়ে, তেলবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো সুযোগ খোঁজে। তেলের দাম বাড়া মানে কেবল আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গ্রাফ ওঠানামা নয়— এটি ভারতের শহর-গ্রামের রান্নাঘরের ব্যয়, পরিবহন খরচ, সার-আমদানি, সবকিছুর ওপর চাপ। অর্থাৎ, ভূ-রাজনীতি খুব দ্রুতই জনজীবনের রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে।

আরও বড় প্রশ্ন হলো—মার্কিন কৌশল আসলে কী চাইছে? ‘শাসন বদল’ নাকি ‘আচরণ বদল’? ইতিহাসে দেখা গেছে, বহির্চাপ যত বাড়ে, রাষ্ট্র তত বেশি ভেতরের কঠোরতম গোষ্ঠীর হাতে বন্দী হয়। ফলে বাইরের চাপ ইরানের নীতিতে নমনীয়তা আনবে— এমন সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনই আছে কঠোরতার পুনরাবৃত্তি। এই জটিলতার মধ্যে ভারতের জন্য সবচেয়ে বাস্তববাদী পথ হলো— ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি: একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সমুদ্রপথ সুরক্ষা, অন্যদিকে মানবিক উদ্বেগ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নীতিগত স্পষ্টতা। সমস্যা হলো, ভারসাম্য নীতি— এটা স্লোগান দিয়ে হয় না; এটা হয় ধারাবাহিক, নির্ভুল এবং প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক কূটনৈতিক কাজ দিয়ে।

তেহরানের বাঙ্কার, উপসাগরের নৌবহর, এবং রাস্তায় জমে ওঠা ক্ষোভ— এই তিনটি দৃশ্য আমাদের শেষ পর্যন্ত একটি মৌল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: রাষ্ট্র কী দিয়ে টিকে থাকে— ভয় দিয়ে, বৈধতা দিয়ে, না জনগণের সম্মতি দিয়ে? যে রাষ্ট্র নিজের সর্বোচ্চ নেতাকে মাটির নিচে নামাতে বাধ্য হয়, সে রাষ্ট্র বাইরে শক্ত দেখালেও ভেতরে অনাস্থা ও আতঙ্কের ভার বহন করে। আর যে রাষ্ট্র নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে কেবল প্রচারের পোস্টারে পরিণত করে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের স্বার্থকেই ঝুঁকির হাতে তুলে দেয়। এই মুহূর্তে ইরানের সংকট তাই শুধু ইরানের নয়— এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির অনিশ্চয়তা, এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বাস্তবতারও এক তীক্ষ্ণ পূর্বাভাস। তেহরানের বাঙ্কার হয়তো বোমা ঠেকাতে পারে; কিন্তু ক্ষুধা, ক্ষোভ এবং ইতিহাসের চাপ— সেগুলোকে ঠেকাতে পারে না। সেই চাপই আজ ইরানকে অস্তিত্বের সংকটে দাঁড় করিয়েছে; এবং সেই সংকটের ঢেউ ভারতকেও স্পর্শ করবে—দিল্লি যতই নীরব থাকুক না কেন।

Advertisement