• facebook
  • twitter
Sunday, 18 January, 2026

রক্তাক্ত ইরান: ইতিহাসের সামনে ইসলামী প্রজাতন্ত্র

ইরানের রাজপথ আজ আর নিছক প্রতিবাদের মঞ্চ নয়; তা পরিণত হয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার গভীর বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে

শেক্সপিয়ার মালিতা: ইরানের রাজপথ আজ আর নিছক প্রতিবাদের মঞ্চ নয়; তা পরিণত হয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার গভীর বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে। শতাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং তার জবাবে রাষ্ট্রের কঠোর দমন-পীড়ন দেশটিকে এক অভূতপূর্ব সংকটে ঠেলে দিয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আহতদের সারি, মর্গে মরদেহ রাখার জায়গার অভাব, চিকিৎসকদের অসহায় কণ্ঠ—এই চিত্র কোনো একক ঘটনার নয়, এটি একটি দীর্ঘদিনের জমে ওঠা সংকটের বিস্ফোরণ, যার অভিঘাত আজ শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই।
এই আন্দোলনের সূচনা ​আকস্মিক নয়।

ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরেই চাপের মুখে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ব্যর্থতার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ইরানি রিয়ালের ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কার্যত বিপর্যস্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অথচ আয় বাড়ছে না। এই আর্থিক সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে আঘাত হেনেছে যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ সময়ের অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু ছিল না।

Advertisement

তবে এই আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক নয়। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অসন্তোষ। বাধ্যতামূলক হিজাব, ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ এবং মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা—বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে— ইরানের সমাজে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ তৈরি করেছিল। ২০২২ সালে নীতি পুলিশের হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যু সেই চাপকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। তখনকার আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করা হলেও ক্ষোভ মুছে যায়নি। বরং তা সমাজের গভীরে জমে থেকে আজকের বিস্ফোরণের পথ তৈরি করেছে।

Advertisement

এবারের আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর বিস্তার ও সামাজিক বৈচিত্র্য। এটি আর কেবল তেহরান বা বড় শহরের মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ছোট শহর, প্রান্তিক অঞ্চল, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজ— সবাই এতে যুক্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রায় ৪৭ বছরের ইতিহাসে এত ব্যাপক ও সমন্বিত সরকারবিরোধী আন্দোলন আগে দেখা যায়নি। এই বিস্তারই আন্দোলনটিকে আগের সব প্রতিবাদের তুলনায় আরও গভীর ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া আরও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, গণগ্রেপ্তার, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ— এসব পদক্ষেপে সাময়িকভাবে রাজপথ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও তা সংকটের মূল সমস্যার সমাধান করে না। বরং প্রতিটি নিহত ও আহতদের ঘটনা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাসপাতালের মর্গে একের পর এক মরদেহ স্তূপ করে রাখা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের শক্তির পরিচয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতারই প্রতীক।

এই সংকটের মানবিক দিকটি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, আহতের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে অনেকের ক্ষেত্রে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগই ছিল না। মাথা ও বুকে গুলিবিদ্ধ তরুণদের অনেকেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গিয়েছেন। তাঁদের বেশিরভাগই কুড়ি থেকে পঁচিশ বছরের তরুণ। এই অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার অপমৃত্যু। কোনো রাষ্ট্র যদি তার তরুণদের স্বপ্ন রক্ষা করতে না পারে, তবে তার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকট ক্রমশ আন্তর্জাতিক রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের উদ্বেগ, নির্বাসিত রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী রেজা পাহলভির আহ্বান— সব মিলিয়ে ইরান আজ বহুমুখী চাপের মুখে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বাইরের হস্তক্ষেপে কোনও দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং তা প্রায়শই জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া উসকে দিয়ে সহিংসতা আরও বাড়ায়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি স্পষ্ট।রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের কৌশলও সামনে এসেছে। সরকার সমর্থক মিছিল নামানো হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্র আরও সক্রিয় করা হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, ক্ষমতাকাঠামো এখন সংঘাতের রাজনীতিকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শক্তির প্রদর্শন রাষ্ট্রকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। শাসনের প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে জনগণের সম্মতি ও আস্থার ওপর, কেবল ভয় বা দমননীতির ওপর নয়।এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— ইসলামী প্রজাতন্ত্র কি পরিবর্তিত সমাজের বাস্তবতা স্বীকার করতে প্রস্তুত? ইরানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ।

তারা সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে তারা অন্য সমাজের জীবনযাত্রা ও স্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে পরিচিত। তাদের প্রত্যাশা আর আগের মতো নয়। তারা শুধু অর্থনৈতিক স্বস্তি নয়, সামাজিক মর্যাদা, মত প্রকাশের অধিকার এবং নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়। এই প্রজন্মকে উপেক্ষা করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে না।ইরান আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে অনমনীয়তা, দমন-পীড়ন ও সংঘাতের পথ; অন্যদিকে রয়েছে সংলাপ, সংস্কার এবং ধীরে হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, তা শুধু বর্তমান সংকট নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে— রাষ্ট্র জনগণের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিন উপেক্ষা করতে পারে না। রক্তাক্ত রাজপথ কখনও স্থায়ী শাসনের ভিত্তি হতে পারে না। ইরানের ক্ষেত্রেও সত্যিকারের স্থিতি আসবে তখনই, যখন রাষ্ট্র শক্তির ভাষা ছেড়ে জনগণের ভাষা শোনার সাহস দেখাবে। অন্যথায় এই সংকট শুধু ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব রাজনীতির ওপর।
ইরান আজ নিজের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি। সেই প্রশ্নের উত্তর বুলেট বা বুটের শব্দে লেখা যায় না। তা লিখতে হয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং পরিবর্তনের সাহস দিয়ে। এই উত্তরই নির্ধারণ করবে— ইরান কি রক্তাক্ত অতীতের ভার বহন করেই এগোবে, নাকি নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

Advertisement