আমেরিকা একের পর এক শুল্কবাণে ভারতকে নাজেহাল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। আর সেই চোখ রাঙানির মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সেরে ফেলল ভারত। মঙ্গলবার হায়দরাবাদ হাউসে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লায়েন ও ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তনিও কোস্টা এবং ইউ নেতাদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বলেন, ‘এই চুক্তি ভারতের ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ এবং ইউরোপের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য এক বিশাল দরজা খুলে গেল।’
এদিকে কূটনৈতিক মহলের দাবি, ভারত ও ইউরোপের এই চুক্তিতে কার্যত একঘরে হতে চলেছে আমেরিকা।মঙ্গলবার সকালে গোয়ায় ইন্ডিয়া এনার্জি সপ্তাহের উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার সময়েই ‘মাদার অফ অল ডিলস’-এর কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, ‘ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি যুগান্তকারী চুক্তি সই হচ্ছে। এই চুক্তিতে যে লেনদেন হবে, তা বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।’ এই চুক্তি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে।
Advertisement
কেন্দ্রীয় সরকার জানাচ্ছে, চুক্তিতে মোট ২৪টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে যেমন পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে, তেমনই জায়গা করে নিয়েছে বিনিয়োগ সুরক্ষা, জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন। চুক্তির ফলে রপ্তানিতে ব্যাপক সুবিধা পাবে দিল্লি। ইউরোপের দেশগুলিতে বস্ত্র, রাসায়নিক, রত্ন ও গয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, চামড়ার জিনিস, জুতো ইত্যাদি কম শুল্কে বিক্রি করতে পারবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যে গড়ে ৩.৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ। সেখানে ইউরোপের পণ্যে ভারত গড়ে ৯.৩ শতাংশ শুল্ক বসায়। চুক্তির ফলে উভয় পক্ষের ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যে হয় শুল্ক কমবে, নয়তো পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
Advertisement
এমনিতেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্য সহযোগী। রিপোর্ট বলছে, ২০২৩-২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য হয়েছে ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের। এই চুক্তির ফলে মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে আরও জোয়ার আনবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট ২৭টি দেশ রয়েছে। ২৭টি দেশের এই জোটের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতায় ঠিক কোন কোন বিষয় রয়েছে, তা এখনও সরকারিভাবে জানানো হয়নি। যদিও এই চুক্তির মধ্যে ভারতের দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য এবং কৃষিক্ষেত্রকে রাখা হয়নি বলেই জানা যাচ্ছে। তবে উৎপাদন, প্রযুক্তি, শক্তিসম্পদ, ওষুধের মতো ক্ষেত্রগুলিকে চুক্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে খবর। চুক্তি সই হলেও তা পুরদমে বাস্তবায়িত হতে সময় লাগবে বলে খবর। ২০২৭ সাল থেকে শুরু হতে পারে ভারত-ইউরোপ মুক্ত বাণিজ্য।
হায়দরাবাদ হাউসে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে অভিবাদন করে বলেন,‘দুই পক্ষই লাভজনক অংশীদারত্ব বেছে নিয়েছে। আমরা করে দেখালাম।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বলেন,‘ঐতিহাসিক ডিল, দুই পক্ষের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরু হলো।’ ১৯ বছরের অপেক্ষা শেষে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারতের সামনে দারুণ সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মত অনেকের।
ইউরোপিয়ান কমিশনের সভাপতি উরসুলা জোর দিয়ে বলেন,‘এই চুক্তি উভয় পক্ষের পরিপূরক শক্তিকে একত্রিত করবে। চুক্তিটি শুধু বাণিজ্য ক্ষেত্রেই নয়, বাণিজ্যের বাইরেও বিস্তৃত, যা ভারত এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে সমন্বয়কে আরও দৃঢ় করবে।’ তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে চার বিলিয়ন ইউরো ট্যারিফ সাশ্রয় হবে এবং বাণিজ্য ক্ষেত্রে বাড়বে লাভ ও সাপ্লাই চেন।
উরসুলার মতে,‘এই চুক্তির ফলে ভারতীয় স্কিলের সঙ্গে মিলবে ইউরোপের প্রযুক্তি। যা বাড়াবে দক্ষতা ও পরিষেবার স্কেল। উদ্ভাবনী শক্তিকেও বৃদ্ধি করবে। যা কোনও দেশের একার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। ভারতের উত্থান বিশ্বের জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।‘ এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন,‘এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়, এটি সমৃদ্ধির একটি নীল নকশা।‘ চুক্তির পাশাপাশি ভারতের আথিথেয়তারও ভূয়সী প্রশংসা করেন উরসুলা। উল্লেখ্য, এই চুক্তি নিয়ে প্রথম ২০০৭ সালে আলোচনা শুরু হয়েছিল, পরে ২০১৩ সালে তা স্থগিত হয়ে যায়। এর পরে ২০২২ সালের জুনে আবারও এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
Advertisement



