হীরক কর: ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে সবাই আমরা জানি। এটাও জানি,যাই হোক না কেন, ভারত তার প্রাথমিক তিন বছর ধরে বেশিরভাগ সময় ১৯৩৫ সালের ভারতীয় আইনসভার দ্বারা শাসিত ছিল। ভারতের গণপরিষদ ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের সংবিধান প্রণয়ন করে। এই গৌরবময় পদক্ষেপটি ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হয়। ১৯৩০ সালের এই দিনেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজ (সম্পূর্ণ স্বশাসন) স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করে । তাই সংবিধান অনুমোদনের জন্য ২৬ জানুয়ারি তারিখটিকে সরকারী তারিখ হিসেবে বেছে নেয়।
স্পষ্টতই, ভারতের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিদ্যমান শাসন কাঠামো উপযুক্ত নয়। আমরা ১.৪ বিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার একটি জাতি। এই সংখ্যা ইউরোপের ৫১টি দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। এত বিশাল জনসংখ্যা পরিচালনার চ্যালেঞ্জগুলো অপরিসীম। আমাদের নেতারা যতই সদিচ্ছাসম্পন্ন হোন না কেন, নিছক শ্রেণিবিন্যাসের কারণে প্রতিটি নাগরিকের চাহিদা কার্যকরভাবে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
Advertisement
ভারত, তার অবিশ্বাস্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, তার জনগণের জন্য মৌলিক বিষয়গুলো – নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, বিশুদ্ধ জল, গ্রামে সামগ্রিক বিদ্যুতায়ন, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং সহজলভ্য মানসম্পন্ন শিক্ষা – সকলের জন্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিটি বৈষম্য, আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব এবং শাসনের একটি অপ্রতিরোধ্য বোঝার সাথে লড়াই করে চলেছে। ভারতের সম্ভাবনা এবং এর বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য উপেক্ষা করা অসম্ভব।
Advertisement
গত ৭৭ বছরে ভারতে অসাধারণ অগ্রগতি সত্ত্বেও, এই প্রবৃদ্ধির বেশিরভাগই রাজনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নয়, বরং পরিস্থিতির তীব্রতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। ভারতের সমস্যাগুলো নতুন নয়, এবং সেগুলো সমাধানে দেশটির অক্ষমতা তার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গভীরভাবে প্রোথিত। সঠিক আইন প্রয়োগের অভাব, প্রশাসনের অদক্ষতা এবং অতীত ও বর্তমান উভয় সরকারের ব্যাপক দুর্নীতি দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলেছে।
সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার বছর আগের তুলনায় এখন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনেরা ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি আশাবাদী। ২০২০ সালের তুলনায় এখন ১০ শতাংশ বেশি উত্তরদাতা মনে করে, ভারত সঠিক পথে এগোচ্ছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি প্রবাসী ভারতীয়দের সমর্থনও জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে এই সমীক্ষায়। অনেকে মনে করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচন ভারতের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।
‘ইন্ডিয়ান আমেরিকান অ্যাটিটিউডস সার্ভে ও গবেষণা’ সংস্থা “ইউগভ” যৌথভাবে এই সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষার রিপোর্ট মার্চ মাসের গত বছর দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত হয়। এই সমীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫ মিলিয়ন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনের মতামত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনেরা এখনও সতর্ক।
এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতি ও পারস্পরিক কর আরোপের হুমকি। অনেকে মনে করেন, কমলা হ্যারিসের অধীনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও ভালো হতে পারত। তবে সামগ্রিকভাবে ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করে, ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক উন্নত হবে, যেখানে ২৬ শতাংশ অবনতির আশঙ্কা করছে এবং ৩৪ শতাংশ কোনো পরিবর্তনই আশা করছে না।
ভারতের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমান প্রশাসনের নীতিগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। মাত্র ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা মোদির প্রশাসনের সমালোচক। বাকি ১৮ শতাংশের কোনো মতামত নেই। এই ইতিবাচক মনোভাবের পেছনের মূল কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, ভারতের ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল। অনেকে মনে করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচন ভারতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ ও একটি শক্তিশালী বিরোধী দল তৈরি করেছে।
৪১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করে, এই নির্বাচন ভারতকে আরও গণতান্ত্রিক করেছে। তবে ২৮ শতাংশ উত্তরদাতা দ্বিমত পোষণ করেছে। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করে, গণতন্ত্রের ওপর এই নির্বাচনের কোনো প্রভাব পড়েনি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনদের মধ্যে বিজেপি এখনও সবচেয়ে পছন্দের রাজনৈতিক দল। ২৮ শতাংশ উত্তরদাতা মোদির বিজেপিকে সমর্থন করে। ২০ শতাংশ সমর্থন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেস। অন্যদিকে, অন্য দলগুলোর প্রতি সমর্থন ২০২০ সালের পর ১১ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
গত চার বছরে প্রবাসীদের মধ্যে মোদির অনুমোদন রেটিং স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২০ সালে ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা মোদির কর্মক্ষমতা অনুমোদন করেছিল। ২০২৪ সালে এটি ছিল ৪৭ শতাংশ। তবে বিভিন্ন পরিসংখ্যানজুড়ে এই রেটিংয়ের পরিবর্তন দেখা গেছে। যেমন—তরুণদের মধ্যে মোদির সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু নিম্ন আর্থসামাজিক স্তরে কিছুটা কমেছে।
আগামীদিনে বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI। সেজন্যই ভারত AI মিশন নিয়েছে। আর এআই মিশনে কেন্দ্রীয় সরকার ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে। গ্রাম-শহরের ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে এআই-কে সামাজিক ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলাই এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য। এআই মিশনে ভারত যে বিশ্বে প্রথম সারিতে উঠে এসেছে, তারও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের গ্লোবাল এআই ভাইব্রেন্সি টুলে ভারত তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের পরই রয়েছে ভারত। দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন, জাপান, সিঙ্গাপুর, কানাডা, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশকে পিছনে ফেলে এই অবস্থান ভারতের দ্রুত ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম ও শক্তিশালী প্রতিভা ভান্ডারের সাক্ষ্য বহন করে।
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও সরকার সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকে জাতীয় প্রযুক্তি মিশনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে নয়ডা ও বেঙ্গালুরুতে ৩ ন্যানোমিটার চিপ ডিজাইনের দুটি অত্যাধুনিক কেন্দ্র চালু হয়েছে। ভারতের লক্ষ্য, আমদানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্মাণ। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও সুপার কম্পিউটারের মূল ভিত্তি এই ৩nm চিপ।
একই সঙ্গে IIT মাদ্রাজের SHAKTI উদ্যোগে ৭nm প্রসেসর ডেভেলপমেন্ট চলছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সেমিকন ইন্ডিয়া সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয় ভারতের প্রথম স্বদেশি ‘বিক্রম ৩২-বিট’ চিপ। ২০২৫ সালেই আরও ৫টি সেমিকন্ডাক্টর ইউনিটের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফলে মোট ইউনিটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০টি। ৬টি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা এই প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১.৬০ লক্ষ কোটি টাকা। আর এই মিশনের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজারের ১০ শতাংশ দখল করা। এই ভাবেই এগিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের ভারত।
Advertisement



