• facebook
  • twitter
Thursday, 22 January, 2026

নেতাজির রাষ্ট্র দর্শন

মান্দালয় জেলে থাকার সময় তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা জীবন লাল চট্টোপাধ্যায় এর কাছ থেকে নেতাজি সমাজবাদী সাহিত্য কর্ম সম্বন্ধে অবহিত হন

শুভেন্দু চ্যাটার্জী:  রুশ বিপ্লব বা সোভিয়েত রাশিয়ার বিপ্লব সম্পর্কে এবং সেই দেশের আভ্যন্তরীণ ঘটনাবলী সম্পর্কে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন কালেই অবহিত হয়েছিলেন। বন্ধু চারুচন্দ্র গাঙ্গুলিকে একটি চিঠিতে লেখেন তিনি পাশ্চাত্য জগৎ দেখাইয়াছে “power of the people”কি করিতে পারে, তার উজ্জ্বলতর দৃষ্টান্ত হচ্ছে the first socialist republic in the world অর্থাৎ রাশিয়া। ভারতের উন্নতি যদি কোনদিন হয় সেটা আসবে ঐ power of the people এর ভিতর দিয়া।

মান্দালয় জেলে থাকার সময় তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা জীবন লাল চট্টোপাধ্যায় এর কাছ থেকে নেতাজি সমাজবাদী সাহিত্য কর্ম সম্বন্ধে অবহিত হন। সিওনি সাব জেলে বন্দি থাকার সময়ও সুভাষচন্দ্র সমাজবাদী সাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সুভাষচন্দ্র জেলে কারারুদ্ধ থাকাকালীন,তাঁর বন্ধুকে লেনিনের লেখা the man form volga তাঁকে জেলের অভ্যন্তরে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেন। এই সময়ে তিনি এঙ্গেলসের সোসালিজম ইউটোপিয়ান এন্ড সাইন্টিফিক এবং লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান গ্রন্থ দুটি পাঠ করেন।

Advertisement

যেকোনো ধরনের মতবাদেরই অন্ধ অনুকরণ অপছন্দ করতেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তবে এ কথা অনস্বীকার্য সমাজবাদের প্রভাব সুভাষচন্দ্রের ওপর সবথেকে বেশি পড়েছিল। ভারতবর্ষে শ্রমিক আন্দোলনে সমাজবাদী বিশ্বাসী যেসব গোষ্ঠী আছে তাদের সুভাষচন্দ্র বসু তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন ১) দক্ষিণপন্থী যারা সংস্কারবাদী কর্মসূচির পক্ষে। ২) কমিউনিস্ট যারা মস্কোর অনুগত এবং অনুসারী। ৩) সেই গোষ্ঠী যারা সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা কিন্তু যাঁরা চান ভারত তার নিজের ধরনের সমাজতন্ত্রের তার নিজস্ব পদ্ধতির বিকাশ করুক। সুভাষচন্দ্র নিজেকে এই তৃতীয় গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করতেন।

Advertisement

সুভাষচন্দ্র বসু যে সমাজবাদে বিশ্বাস করতেন তার বৈশিষ্ট্য গুলি হল ১) পূর্ণ স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপিত হবে মানুষের সাম্যের ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ওপর। ২) মানুষ্য সৃষ্ট সকল প্রকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের অবসান কল্পে এবং পুরুষের দাসত্ব থেকে নারীর মুক্তি অর্জনের জন্য এক স্বাস্থ্যকর সমাজবাদের ধাঁচে জাতীয় সাধনাকে গড়ে তুলতে হবে।৩) যেহেতু সামাজিক স্বাধীনতার অর্থ হল নারী-পুরুষ উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণ ধনী-দরিদ্র, বৃদ্ধ যুবক নির্বিশেষে সকল শ্রেণী, সকল সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সকল ব্যক্তির জন্য স্বাধীনতা; তাই স্বাধীনতা সমতার দ্যোতক।

ঘন বৈষম্য দূর করতে হবে শিক্ষার সমসুযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ৪) সমাজবাদের মূলনীতি হবে পাঁচটি ন্যায়বিচার সাম্য, স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা এবং ভালোবাসা। ৫) ভারতবর্ষের জন্য প্রয়োজন এক সমাজবাদী প্রজাতন্ত্র যার মূল নীতি হবে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করা হলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সুভাষচন্দ্রের অন্যতম ভ্রাতুষ্পুত্র অমিয়নাথ বসু জানিয়েছেন যে-১৯৩২ সালের গোড়ার দিকে জব্বলপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকার সময় সুভাষচন্দ্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

চিকিৎসার জন্য তাঁকে ওই বছর আগস্ট মাসে মাদ্রাজের পেনিটেনশিয়ারিতে স্থানান্তরিত করা হয়। সুভাষচন্দ্র বসুর ইচ্ছা ছিল ইউরোপ প্রবাসের সময় তিনি কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক অর্থাৎ কমিনটার্নের সঙ্গে,এই থিসিস নিয়ে আলোচনা করবেন। সুভাষচন্দ্রের মতবাদ ছিল ভারতবর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় এক সমাজবাদী প্রজাতন্ত্র। কম কমিন্টার্নের তিনজন প্রতিনিধি যার মধ্যে ক্লেমেন্স দত্ত অন্যতম ছিলেন। তাঁদের সাথে আলোচনা হয়েছিল কিন্তু ঐক্যমত হয়নি। অমিয় বসুর মতে– একটি সমাজতন্ত্রী দল গঠন করে সশস্ত্র বিপ্লব সংঘটিত করার লক্ষ্য ছিল সুভাষচন্দ্রের। সেজন্য তিনি কমেন্টার্নের সাহায্য চাইতে প্রস্তুত ছিলেন।

তবে তার নিয়ন্ত্রণে যেতে তিনি রাজি ছিলেন না। সুভাষচন্দ্র যে থিসিস রচনা করেছিলেন সেটি “হিন্দুস্তানি সাম্যবাদী সঙ্ঘ” নামে পরিচিত। তিনি এমন একটি দল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যেখানে কায়েমি স্বার্থসম্পন্ন সম্প্রদায়ের পরিবর্তে জনসাধারণের প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত হবে দলটি। যাতে সকল শ্রেণীর জনগণ ন্যায়বিচার পায় তার দিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এবং জনগণকে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বন্ধন থেকে মুক্ত রাখা হবে। তবে সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাবিত সাম্যবাদী সংঘ এবং তাঁর ঘোষিত কর্মসূচিকে তৎকালীন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের মুখপত্র international press correspondence তীব্র ভাবে সমালোচনা করে, উল্লেখ করে the programme of Bose does not present away to liberate India. তবে অবশ্যই নেতাজি মনে করতেন ভারতের দারিদ্রতা, নিরক্ষরতা, ব্যাধি দূরীকরণ এবং বৈজ্ঞানিক পন্থায় উৎপাদন ও বন্টন এর মত প্রধান জাতীয় সমস্যা গুলি সমাজবাদী পন্থা ছাড়া কখনই পরিপূর্ণ করা সম্ভব নয়।

সুভাষ চন্দ্রের মতে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা লক্ষ্য হবে তিনটি ১) আত্মত্যাগের জন্য দেশবাসীর প্রস্তুতি ২) জাতীয় ঐক্য এবং ৩) স্থানীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের বিকাশ সাধন। হরিপুরা কংগ্রেসের সুভাষ চন্দ্রের ভাষণ ‘সুভাষবাদী সমাজতন্ত্র’ নামে পরিচিত। সুভাষ চন্দ্রের রাষ্ট্রচিন্তার মূল দর্শন দুটি ছিল এক সমাজবাদ অপরটি সমন্বয়বাদ। সুভাষচন্দ্র বসু নাৎসি জার্মানি ও হিটলার কে পছন্দ করতেন না। বার্লিনে অবস্থানকালে সুভাষচন্দ্রের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল এক চেট ভদ্রমহিলা তাঁর নাম কিট্টি কুর্তি। সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে লিখেছিলেন হিটলার একজন বিপদজনক মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত এক ব্যক্তি, যার মধ্যে শয়তান প্রভুত্ব করে।

১৯৩৬ সালের ১২ ই নভেম্বর দিল্লির সভায় ভাষণ দান কালে সুভাষচন্দ্র উল্লেখ করেন ‘I am opposed to Hitlerism whether in India within the Congress or any other country, but it appears to me that socialism is only the alternative to hitlerism’ (অনিল রায়/নেতাজির জীবনবাদ পৃষ্ঠা ৩৯) আসলে নেতাজির রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে একমাত্র চিন্তা ছিল স্বদেশ চিন্তা girijakumar Mukherjee /Subhash Chandra Bose নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ‘his last thoughts must have been India, for his first thought every morning was also India’ (page 104) পরিশেষে বলা যায় নেতাজির রাষ্ট্রচিন্তা রাষ্ট্র দর্শন সবই মূলত সমাজবাদ সাম্যবাদের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল।

Advertisement