• facebook
  • twitter
Monday, 19 January, 2026

গোরাচাঁদবাবুর গল্প

গোরাচাঁদবাবু দুরুদুরু বুকে বটতলায় চলে এসে খুব হতাশ হয়ে দেখলেন, গীতবিতান পড়েই আছে। তবে মনে হল কেউ যেন একটু নেড়েচেড়ে দেখে আবার রেখে দিয়েছেন।

কাল্পনিক চিত্র

সুব্রত সরকার

এই ভাবনাটার কথা হয়তো কোনওদিনই মাথায় আসত না গোরাচাঁদবাবুর। ভাবনাটা এতই সংক্রামক যে, গোরাচাঁদবাবু ধীরে ধীরে কেমন আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। ভাবছেন আপনমনে। শুরু করতে চাইছেন একটু গোপনে। খানিকটা চুপিচুপি।

Advertisement

অনেকদিন তো হয়ে গেল ফিরে এসেছেন মেয়ের কাছ থেকে। মেয়ের প্রবাস জীবন কত কাছ থেকে পাক্কা দু’মাস চারদিন দেখেছেন। কত অভিনব, অপূর্ব, আধুনিক সব জিনিস দেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন এই চৌষট্টি দিনের বিদেশ-বাসে। তবে সবচেয়ে যে দুটো জিনিস দেখে ভালো লেগেছে, তা হল রাস্তার মোড়ে মোড়ে বুকব্যাঙ্ক ও বাড়ির অতিরিক্ত জিনিস অপরের জন্য পথের ধারে সাজিয়ে রাখা।

Advertisement

বাড়ির অতিরিক্ত মানে জরাজীর্ণ, প্রায় অচল এমন নয়, রীতিমত ব্যবহারযোগ্য জিনিসগুলোকে পরিপাটি করে সাজিয়ে তার ওপর ‘ফ্রি’ লেখা ট্যাগ লাগিয়ে ফুটপাতের ওপর রাখা থাকতে দেখেছেন এবং এও দেখেছেন, কেউ না কেউ সে সব নিয়ে গেছেন। যাঁর যেটা প্রয়োজন, তিনি হয়তো সেটাই নিয়েছেন, অন্যটা নিয়ে যাননি। এই অতিরিক্ত না নেওয়ার সংযমকে সমীহ করতেই হয়।

গোরাচাঁদবাবুর একক জীবন আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল। তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবন অকস্মাৎ শেষ হয়ে যায় কর্কটরোগে আক্রান্ত স্ত্রীকে হারিয়ে। সেই থেকে একা। বাড়িটা অনেক শখ করে সাজিয়ে গুছিয়ে করেছিলেন। বেশ বড় দোতলা বাড়ি। দুটো ছাদ। ওপেন টেরাসে সাধের বাগান। কত বাহারি ফুল, অর্কিড ও ক্যাকটাস দিয়ে সাজানো। আর খোলাছাদে দোলনা রয়েছে। আজ সবই কেমন অনাদরে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে রয়েছে মস্ত বড় বাড়িটায়। দোলনায় ধুলো জমতে জমতে কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে। হাওয়া এসে দোল দিয়ে যায় দোলনায়, মানুষ কেউ দোল খায় না আজ আর!

আজ তাই বাড়ির বহু জিনিসকেই মনে হয় অতিরিক্ত। এগুলো গোরাচাঁদবাবুর জীবনে আর দরকার হবে না। জীবন এখন গোটাতে গোটাতে ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। প্রয়োজনের জিনিসের তালিকা সংক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে। তাই ভাবছেন, এবার তো এগুলোকে বিলিয়ে দিলে, দিয়ে দিলেই হয়। কত মানুষের কত কাজে লাগবে। এখনো এগুলো ব্যবহারযোগ্য আছে। বাড়ির পুরোনো কাজের মেয়ে পলিকে অনেক জিনিস দেওয়া হয়েছে। পলি আবার ওর পরিচিতদেরও দিয়ে দিয়েছে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে কত জিনিস। মেয়েকে সব বলারও দরকার হয় না। ও মায়ের স্মৃতির কিছু জিনিস কাউকে কোনওদিন না দিতে বলে দিয়েছে। গোরাচাঁদবাবু সেগুলো সযত্নে সরিয়ে রেখে বাড়তি, আর প্রয়োজন নেই অথচ ব্যবহার করা যাবে দিব্যি এমন কত জিনিস দিয়েও দিয়েছেন।

এই তো গত মাসে ব্রতীনকে দিয়েছিলেন অনেকগুলো থালা বাটি গ্লাস। সবই স্টিলের। ব্রতীন আদিবাসী শিশুদের একটা স্কুল করেছে সাঁওতালপল্লিতে। ওখানকার দুঃস্থ বাচ্চাদের কথা ভেবে এর আগে অনেক খাতা, পেন্সিল, পুরোনো জামা, চাদর, বিস্কুট, চানাচুর দিয়েছেন। তাই ব্রতীনকে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ গো, তোমার বাচ্চাদের জন্য নিয়ে যাবে নাকি কিছু স্টিলের থালা, বাটি গ্লাস।’ ব্রতীন ব্যাগ ভর্তি করে নিতে নিতে বলেছিল, ‘এগুলো পেয়ে বাচ্চাগুলো কত খুশি হবে, আপনি ভাবতে পারবেন না।’

এক সপ্তাহ পরে জেনেছিলেন, থালা, বাটি, গ্লাসগুলো নিয়ে ওদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। তাই শেষপর্যন্ত লটারি করে দেওয়া হয়েছে। যার ভাগ্যে যা পড়েছে, তাই নিয়েই নাকি ওরা খুশি মনে নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেছে।

ব্রতীনের কাছ থেকে এই কথা জেনে, গোরাচাঁদবাবু অবাক হয়েছেন। কতগুলো পুরোনো বাসন, তাও লটারি করে ভাগ বাঁটোয়ারা করতে হয়েছে! হায় রে কত কাঙাল আমার দেশ!

আজ গোরাচাঁদবাবু মনস্থির করে ফেলেছেন, বিদেশে দেখে আসা অভিজ্ঞতা নিজের দেশে কেমন কাজ করে, তা একবার পরখ করে দেখলে কেমন হয়। তিনি যে অঞ্চলে থাকেন, তাকে শহরতলি বলা যায়। মধ্যবিত্ত মানুষের ভিড়ে যেমন কিছু উচ্চবিত্তরা রয়েছেন, তেমন আবার কিছু অভাবী দিন আনা দিন খাওয়া সাধারণ গরীব মানুষও রয়েছেন। তাঁরা সবাই যে পড়াশোনা না জানা, অশিক্ষিত, তা নন। নিজেরা হয়তো স্বল্পশিক্ষিত কিন্তু সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। তাই গোরাচাঁদবাবু ঘরের অতিরিক্ত জিনিসগুলোকে একজায়গায় জড়ো করতে শুরু করলেন। বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেন। কাজটা পরীক্ষামূলক এবং একটু চুপিচুপিই করতে চান। দেখা যাক কেমন হয় এর অভিজ্ঞতা। তারপর না হয় মেয়েকে জানাবেন। পরিচিতদের বলবেন।

প্রথমদিন নিস্তব্ধ দুপুরে চুপিচুপি বড় কালভার্টের পাশের কদমগাছটার তলায় রেখে এলেন একটা প্লাস্টিকের লাল বালতি ও দু’কৌটোর টিফিন বক্স। বাড়িতে তিনটে বাথরুম। সাতটা বালতি। মানুষ একজন। কোনও কাজে আর লাগে না এত বালতি। টিফিন বক্সটা অফিস-জীবনে মাঝে-মাঝে কাজে লাগত। অবসর জীবন সাত বছর হয়ে গেল। ও টিফিন বক্স সাজিয়ে রেখে দিয়ে কোনও লাভ নেই। দিয়ে দিলে বরং কারও কাজে লাগবে। জিনিসদুটোর পাশে একটা কাগজে লিখে রেখে এলেন, ‘যার প্রয়োজন দয়া করে নিয়ে যাবেন।’

এই অপারেশনটা এত নিখুঁত ও সুন্দর হলো যে, গোরাচাঁদবাবু নিজেই খুব খুশি। বাড়ি ফিরে এসে সারা বিকেল ভাবলেন দেখা যাক কী হয়। সন্ধের পর গুটিগুটি পায়ে চলে গেলেন কালভার্টের কাছে। একটু দূর থেকেই দেখতে পেলেন কদমতলা ফাঁকা। লাল বালতিটা নেই, টিফিন কৌটোও নেই। নেই সেই কাগজটাও— ‘যার প্রয়োজন দয়া করে নিয়ে যাবেন।’ বাহ্। দারুণ তো হলো প্রথমদিনের অভিজ্ঞতা। গোরাচাঁদবাবু খুব খুশি মনে ফিরে এলেন বাড়িতে। এখনই কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। মনে মনে আরও অনেককিছু ভাবতে শুরু করলেন। কাজটা করে বেশ মজা ও আনন্দ পেয়েছেন গোরাচাঁদবাবু। সেই আনন্দে অনেকদিন পর ভুল করে ঘুমের ওষুধ না খেয়েও দিব্যি সাউন্ড স্লিপ দিয়ে ফেললেন।

দ্বিতীয় দিন বেছে নিলেন ধরবাবুদের গলি। ওখানে একটা শনিমন্দির আছে। এবারও বেশ সন্তর্পণে দুটো জিনিস রেখে এলেন। কেউ দেখতে পেল না। জানতেও পারল না। এবার রেখেছেন একটা দেওয়াল ঘড়ি ও বেড কভার। সারাবাড়িতে সেদিন গুণে দেখলেন আটটা ঘড়ি চলছে। কোনও মানেই হয় না। আটটা ঘড়ির ব্যাটারি পাল্টানোর খরচও আছে। তার ওপর কখন কোনটা বন্ধ হয়ে পড়ে থাকছে, তা খেয়াল রাখা মহাঝঞ্ঝাট। তার চেয়ে বরং দু’চারটে ঘড়ি বিলিয়ে দেওয়া ভালো। ঘরে বেডকভার অব্যবহৃত হয়ে পড়ে রয়েছে অনেক। অতসীর বেডকভার কেনার বাতিক ছিল। এক বেডকভারে বেশি দিন ঘুমোতে চাইত না। বলত, পুরোনো বেডকভারে ওর নাকি ভালো ঘুম হয় না! তাই কত বেডকভার প্রায় নতুন হয়ে আলমারিতে আজও শোভা পাচ্ছে। গোরাচাঁদবাবু আর ওগুলো আলমারিতে সাজিয়ে রাখবেন না। ঘড়ি ও বেডকভারের পাশে টুকরো কাগজটাও রেখে এসেছেন— ‘যার প্রয়োজন দয়া করে নিয়ে যাবেন।’

এবারও যথারীতি পরে গিয়ে দেখলেন কারা যেন নিয়ে গেছে জিনিসদুটো এবং কাগজটাও নেই। বড় শান্তি পেলেন মনে। খুব ভালো লাগছে। যাক জিনিসগুলোর সুন্দর ব্যবহার হবে। কেউ কি একাই দুটো নিলেন, নাকি এক একটা জিনিস এক একজন নিলেন! যাক গিয়ে, এভাবে ভেবে লাভ নেই। নিয়ে যখন গেছে, তার কাজে লাগবে বলেই নিয়েছে।

তৃতীয় দিন রায় ফার্মেসির পাশে যে শহিদ বেদি আছে সেখানে একই কায়দায় চুপিচুপি রেখে এলেন এবারও দুটো জিনিস। বড় একটা টর্চ ও লেডিস ছাতা। বাড়িতে ছাতা আছে এখনো গোটা ছয়েক। ব্যবহার হয় না ছাতাগুলো কয়েকবছর ধরে। এরপর কাপড় পচে যাবে। শিকগুলোয় জং ধরে যাবে। তার চেয়ে বরং দিয়ে দিতে হবে একে একে এভাবে। টর্চের ব্যবহার খুব বেশি তো হয় না। ছোট বড় মিলিয়ে বাড়িতে মোট তিনটে টর্চ আছে। আজ মাঝারি টর্চটা দিয়ে এসেছেন। এবং কাগজটা রেখে এসেছেন পাশে— ‘যার প্রয়োজন দয়া করে নিয়ে যাবেন।’

এই ঘরের জিনিস বিলিয়ে দেওয়ার মজাটা গোরাচাঁদবাবুকে বেশ উত্তেজিত করে রেখেছে। এখন দিন-রাত্রিগুলো কেমন রোমাঞ্চকরও হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকবার মনে হয়েছে, এটা একটা অপারেশন। তৃতীয়বারের অপারেশন করে আসার কয়েকঘণ্টা পরে গিয়ে একটু দূর থেকেই দেখে নিয়েছেন টর্চ ও ছাতা নেই। কেউ না কেউ নিশ্চয়ই নিয়ে গেছে। বেশ করেছে। এটাই তো আনন্দ গোরাচাঁদবাবুর।

আজ চতুর্থ বার অপারেশনে যাবেন। মাঝে কয়েকটাদিন আর যাননি। পেনশনার অ্যাসোসিয়েশনের বন্ধুদের সঙ্গে তিনদিনের জন্য গালুডি বেড়াতে গিয়েছিলেন। বেড়িয়ে এসে মনটা বেশ ফুরফুরে। আবার দু’মাস পর এক সপ্তাহের জন্য ডুয়ার্সে যাওয়া হবে সেটাও পাকা করে এসেছেন। তাই খুশির প্রাণ গড়ের মাঠ!

চতুর্থ অপারেশনে দুটো বই নিয়েছেন। বইদুটো খুবই ভালো। কিন্তু দুটো বইই ঘরে একাধিক রয়েছে। তাই এক কপি করে বিলিয়ে দিলেই ভালো। একটা বই শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত। অপর বইটি গীতবিতান। কথামৃত পড়তে অতসী খুব ভালোবাসত। গোরাচাঁদবাবুও পড়েছেন। তবে গীতবিতান পড়ার আনন্দ ওর কাছে অনেক বেশি। সেই প্রিয় দুটো বই আজ বিলিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে চলে গেলেন রেশন দোকানের পাশের গলিতে। ওখানে একটা শানবাঁধানো বটতলা আছে। সেই বটতলায় বইদুটো সাজিয়ে রেখে পাশে কাগজটাও রাখলেন— ‘যার প্রয়োজন দয়া করে নিয়ে যাবেন।’

এবারও একদম চুপিচুপি, সুন্দরভাবে অপারেশন করে ফিরে এলেন বাড়িতে।
আজ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে গ্রিন-টি করে খেলেন। তারপর নিজেকে তৈরি করে বেরিয়ে পড়লেন বটতলার পথে। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন বটতলায়। একদম কাছে গিয়ে দেখলেন, একটা বই কেউ নিয়ে গেছে। দ্বিতীয় বইটা নেয়নি। পড়ে থাকা বইটা গীতবিতান। একটু পুরোনো কিন্তু পড়তে কোনও অসুবিধা হবে না। বইয়ের বাঁধন এখনো যথেষ্ট ভালো। পাতাগুলোও ঠিক আছে। গোরাচাঁদবাবু বটতলায় বসলেন। একা একাই বসে থাকলেন কিছুটা সময়। পথচলতি লোকজনকে দেখলেন। সবাই বেশ ব্যস্ততার সঙ্গে যাওয়া আসা করছে। বইয়ের দিকে তেমন করে দেখছেনও না কেউ! গোরাচাঁদবাবু ভাবলেন, গীতবিতানটা কি তবে বাড়ি নিয়ে চলে যাবেন। আবার ভাবলেন, থাক আর একটা দিন। দেখা যাক না!

আজ রাতে ভালো ঘুম হলো না। এপাশ ওপাশ করলেন অনেক সময়। দু’চোখে এতটুকু ঘুম নেমে এলো না। গোরাচাঁদবাবু কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছেন। কেন এমন হচ্ছে ঠিক বুঝতেও পারছেন না। এই ক’টা দিন বেশ সফলতার আনন্দ উপভোগ করছিলেন। আজ হঠাৎই কেমন ছন্দপতন হলো। দুটো বইয়ের একটা বই শ্রীরামকৃষ্ণর কথামৃত নিয়ে গেল, কিন্তু গীতবিতান কেউ নিল না! আশ্চর্য।

পরেরদিন ঘুম ভাঙল একটু বেলায়। সারারাত ছটফট করে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই ঘুম থেকে উঠে দেখলেন প্রায় ন’টা বাজে। তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে হাতমুখ ধুয়ে চা করে খেলেন। কাজের মেয়ে এলো, ওকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি করে দে তো। একটু বাজারে যাব। বেলা হয়ে গেল অনেক।’

কাজের মেয়ে পলি বলল, ‘তোমার আবার বেলা কী গো দাদা। তুমি কি আবার অফিস যাবে নাকি!’
‘হ্যাঁরে। আজ একটু অফিসেই যাব। পেনশনের লাইফ সার্টিফিকেটে সই করে দিয়ে আসতে হবে।’ মনে হঠাৎ যা এলো বেমালুম তাই শুনিয়ে দিলেন পলিকে।

পলি একথা শুনে খুব সিরিয়াস হয়ে বলল, ‘ও! তা হলে তো কাজগুলো তাড়াতাড়ি করে দিতেই হবে।’

গোরাচাঁদবাবু দুরুদুরু বুকে বটতলায় চলে এসে খুব হতাশ হয়ে দেখলেন, গীতবিতান পড়েই আছে। তবে মনে হল কেউ যেন একটু নেড়েচেড়ে দেখে আবার রেখে দিয়েছেন। পাশের কাগজটা আজ নেই। উড়ে গেল কি কাগজটা! কে জানে! গোরাচাঁদবাবু গীতবিতানের গায়ে হাত বুলোতে লাগলেন। পাতাগুলো উল্টে উল্টে দেখতে লাগলেন। কত গান। কত মণিমুক্তো। কত বড় সম্পদ আমাদের। এতবড় সম্পদকে কেউ নিয়ে গেল না! দুটোদিন বটতলাতেই পড়ে রইল গীতবিতান!
গোরাচাঁদবাবু বিষন্ন মনে হাঁটছেন। হাতে ধরা গীতবিতান। মনে মনে ভাবছেন, বাড়িতে আর যা কিছু অতিরিক্ত হোক না কেন, গীতবিতান অতিরিক্ত হয় নাকি? প্রতিটি ঘরেই তো একটা করে গীতবিতান রাখা উচিত। যাক, কেউ না নিয়ে ভালোই করেছে। গোরাচাঁদবাবু ভুল করেছিলেন, ভুল ভেবেছিলেন, গীতবিতান একাধিক যখন আছে, একটা না হয় বিলিয়েই দেব! সব কিছু কি আর বিলিয়ে দেওয়া যায়! যাকে আগলে রাখতে হয়, পরম যত্নে ঘরে ঘরে রাখতে হয়, প্রতিদিনের সঙ্গী যে, তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসার আনন্দ এখন গোরাচাঁদবাবুর হৃদয় জুড়ে।

Advertisement