পশ্চিম এশিয়ায় চলা সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পড়ল ভারতেও। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলি শনিবার গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই দেশজুড়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। পাশাপাশি সংসারের বাড়তি খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন জানিয়েছে, ভর্তুকিহীন ১৪.২ কেজি ওজনের গৃহস্থালির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দিল্লিতে বেড়ে হয়েছে ৯১৩ টাকা। আগে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮৫৩ টাকা। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বার রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি। শনিবার থেকে কলকাতায় রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩৯ টাকা। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। প্রতি সিলিন্ডারে ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
Advertisement
শিল্প মহলের কর্মকর্তাদের মতে, পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহণ রুটের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় জ্বালানির দামে চাপ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী।
Advertisement
এরই মধ্যে পেট্রল ও ডিজেলের ঘাটতি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা উড়িয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি। ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড এবং ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন উভয়েই জানিয়েছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
এক বিবৃতিতে ভারত পেট্রোলিয়াম জানিয়েছে, ‘দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য। কিছু এলাকায় পেট্রল ও ডিজেলের ঘাটতির গুজব সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ সংস্থার দাবি, গ্রাহকদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তারা সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় রয়েছে।
ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনও সামাজিক মাধ্যমে জানায়, দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই। তাদের বক্তব্য, ‘দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। নাগরিকদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সরকারি সূত্রের তথ্যের উপর ভরসা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’
এদিকে শেয়ার বাজারেও তেল বিপণন সংস্থাগুলির শেয়ারে চাপ দেখা গিয়েছে। শুক্রবার বাজারে ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের শেয়ার প্রায় ২ শতাংশ পড়ে ৩৫২ টাকা ৯৫ পয়সায় বন্ধ হয়। একইভাবে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের শেয়ার প্রায় ২ শতাংশ কমে ১৬৮ টাকা ১০ পয়সায় নেমে আসে।
রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র হয়েছে। শাসক দল এবং বিরোধীদের মধ্যে মতভেদের তীব্রতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির সাংসদ প্রবীণ খণ্ডেলওয়াল দাম বৃদ্ধিকে সমর্থন করে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি সূচকের নিরিখে এই বৃদ্ধি খুবই সামান্য। গোটা বিশ্বেই জ্বালানির দাম বাড়ছে। বিরোধীদের কাজই হল বিষয়টি নিয়ে অযথা হইচই করা।’
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতা অখিলেশ প্রসাদ সিং বলেন, ‘এটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। ইতিমধ্যেই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ রয়েছে। তার মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের উপর আরও বোঝা বাড়বে। সরকারের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা।’ কংগ্রেসের আর এক নেতা উদিত রাজও প্রশ্ন তুলেছেন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে। তার বক্তব্য, ‘গতকাল পর্যন্ত বলা হচ্ছিল দেশে গ্যাসের কোনও সংকট নেই। তাহলে হঠাৎ করে দাম বাড়ল কীভাবে?’
এদিকে দাম বাড়ার খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আসামের গুয়াহাটির এক গৃহবধূ জানিয়েছেন, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির উপর এর প্রভাব সরাসরি পড়বে। তার কথায়, ‘আমি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ। হঠাৎ শুনলাম গৃহস্থালির সিলিন্ডারের দাম ৬০ টাকা এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম প্রায় ১১৫ টাকা বেড়েছে। এতে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যাবে।’
উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের এক বাসিন্দাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সিলিন্ডার আনতে গিয়ে দেখলাম ৬০ টাকা বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধি চলতে থাকলে আয় থেকে খরচই বেশি হয়ে যাবে।’ দিল্লির এক বাসিন্দা অনিতা জানিয়েছেন, ‘দাম বাড়লে দিল্লিতে থাকা আরও কঠিন হয়ে যাবে। আমাদের একটি সিলিন্ডার এক মাসও চলে না। এতে সংসারে অনেক সমস্যা তৈরি হবে।’
Advertisement



