চিন্ময় বসু
সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে, শরতের আকাশে চাঁদ ভাসছে সাদা মেঘের ভেলায়। সুরকি বেছানো মেঠো রাস্তায় গাড়ির পাশে দৌড়চ্ছে বাদামী রঙের কুকুরটা, গোধূলিবেলায় ঘরের পথে এক গুচ্ছ পাখি। ঠিক যেন সিনেমায় দেখা সুন্দর গ্রামের দৃশ্য; এর সঙ্গে বাউলের গান বা ভাটিয়ালির টান অথবা কোনো বাঁশুরিয়ার বাঁশির সুর মিশে গেলে ষোল কলা পূর্ণ হতো। গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ঐন্দ্রিলা নিজের ভাবে বিভোর।
Advertisement
বাবার হাতে স্টিয়ারিং। মায়ের ভারি শরীর, পেছনের সিটে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে। রবিবারের রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা ছিল। গাড়িতে ট্যাক্সির মতো ড্রাইভারের জন্য ফোন লাগানোর বন্দোবস্ত নেই। তাই ঐন্দ্রিলাই হাতে ফোন ধরে জিপিএস লাগিয়ে রাস্তা দেখিয়ে এসেছে। কলকাতা থেকে বর্ধমান পেরিয়ে গলসির থেকে একটু দূরে বড় রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার পরেও অনেকক্ষণ ঠিক ছিল। হঠাৎ ইন্টারনেট দুর্বল হয়ে ‘জিপিএস লস্ট’ বেরিয়ে এল। রাস্তাটা সামনে ডানদিকে বেঁকে গিয়েছে। বাঁ দিকে একটা গ্রামও দেখা যাচ্ছে। বাবা দো-মনা, কী করবে! ঐন্দ্রিলা গাড়ি থামাতে বলল। নরেন বলে—
—কেন নামবি? এখানে তো কেউ নেই!
—আছে বাবা। দেখতে পাচ্ছি গাছের ফাঁক দিয়ে।
Advertisement
গাড়ি দাঁড়ায়। ঐন্দ্রিলা এগিয়ে চলে পুকুরের দিকে। পুকুরের ওপাড়ে কেবল ধানের ক্ষেত। একজন লোক ছিপ ফেলে মাছ ধরছে। পাশে একটা বই উল্টে রাখা, বইয়ের নাম দেখা যাচ্ছে না। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে মুখ ঘুরিয়ে দেখে। ছেলেটার পরনে ধুতি, চোখে বেশি পাওয়ারের চশমা। ঐন্দ্রিলা জিজ্ঞেস করল
—গোবিন্দপুর সোজা, না বাঁ দিকে?
—এটাই তো গোবিন্দপুর, কার বাড়ি যাবেন?
—ডাক্তার নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি, জানেন?
—চলুন, ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দেব।
উঠে দাঁড়াল। এক নজরে দেখল ঐন্দ্রিলা। ফর্সা, পাতলা, লম্বা— ধুতির ওপরে বেঢপ মাপের হাত-গোটানো ফুল শার্ট, অগোছালো চুল, হাওয়াই চপ্পল পায়ে। আজকালকার দিনে এমন জামা কাপড় কে পরে! চেহারায় শহুরে পালিশের ছোঁয়াও যেন আছে। ছেলেটা এসে দাঁড়ায় গাড়ির পাশে, ছোট্ট হুন্ডাই গাড়ি। জানলা দিয়ে তাকিয়ে নমস্কার করে, মাথা নামিয়ে বলে,
—রাস্তাটা যেখানে দু’ভাগ হয়েছে, বাঁ দিক নিয়ে একটু এগোলে রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা মন্দির আসবে। সেখান থেকে ডান দিক ঘুরলেই দেখা যাবে ডাক্তার ভট্টাচার্যের বাড়ি। দেখলেই চিনতে…
ভদ্রলোক ওকে থামিয়ে দেন— তুমি কি আসতে পারবে আমাদের সঙ্গে?
কী যেন চিন্তা করল, বলল— যদি অনুমতি দেন, আমিই চালিয়ে নিয়ে যেতাম। গ্রামের রাস্তা, কাদা আছে। কয়েক জায়গায় বেশ সরু, আপনার অসুবিধা হবে।
—তুমি গাড়ি চালাতে জানো! এখানেই বাড়ি নাকি?
ছেলেটা হাসে। একটু থেমে বলে— আপনারা যেখানে যাচ্ছেন, আমি চিনি ওঁদের।
গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিল, ঐন্দ্রিলা মনে করিয়ে দেয়— আপনার বই, ছিপ পড়ে রইল!
—আপনাদের ছেড়ে আবার আসব। আমার ছিপ গ্রামের মানুষ চেনে।
গাড়ি দাঁড়াল, বাড়ির সামনে। চাবি দিয়ে বাবা-মাকে নমস্কার করে ঐন্দ্রিলার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে চলে গেল ছেলেটা। ভট্টাচার্যি বাড়িতে গাড়ির আওয়াজে হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছে।
—কখন থেকে অপেক্ষা করছি। বলতে বলতে বেরিয়ে আসে সবিতা, ঐন্দ্রিলার জেঠিমা। সঙ্গে ডাক্তার ভট্টাচার্যও। অনেকক্ষণ চলল, হাসি আনন্দ, প্রণাম-আশীর্বাদ, কুশল-মঙ্গল। কাজের মেয়ে দু’টিও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে পারিবারিক মিলন উপভোগ করছিল। ভট্টাচার্যি পরিবারকে গ্রামের মানুষ শ্রদ্ধা করে, ভালোওবাসে।
মহেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য হরিদেবপুর হাইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই ছিলেন, সাইকেল চালিয়ে রোজ দশ কিলোমিটার যাতায়াত করতেন। স্ত্রী মারা যান যখন বড় ছেলে নগেনের বয়স তেরো, ছোট নরেন ছয়।
গুরুজনদের কথা মেনে বিয়ে করেননি। একাই দুই সন্তানকে মানুষ করেছেন। অবসরের চার বছর আগে তাঁকে সাবডিভিশন হেডকোয়ার্টারের নামি হাইস্কুলে হেডমাস্টার করার কথা চলছিল। কানাঘুষো তাঁর কানেও পৌঁছে যায়। জেলা অফিসে গিয়ে বলে এসেছিলেন, তিনি বাপের ভিটে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। প্রমোশন হল না। ততো দিনে বড় ছেলে নগেন্দ্রনাথ বোম্বেতে নামি হাসপাতালের বড় ডাক্তার। ছোট নরেন্দ্রনাথও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কলকাতায় বিদেশি কোম্পানিতে ভালো চাকরি করে। ছেলেদের বিয়ে দিতে বেগ পেতে হয়নি, দু’জনেই তাদের জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছে। একজন ছাত্রাবস্থাতেই, অন্যজন কর্মক্ষেত্রে। অবসরের বছর দেড়েকের মধ্যেই মহেন্দ্রনাথের শরীর ভাঙতে শুরু করে। ছেলেরা বুঝিয়েছিল বোম্বে বা কলকাতায় এসে থাকতে, ভালো চিকিৎসা হবে। কিন্তু মহেন্দ্রনাথ যে বাড়িতে জীবনের সব থেকে আনন্দের মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন, তা ছেড়ে যাবেন না। সুখের কথা, যেদিন দেহ রাখলেন দুই ছেলে পাশেই ছিল। তারপর দুই দশকে মহেন্দ্রনাথের ভিটে ঝোপ জঙ্গলে ধ্বংসাবশেষ প্রায়।
একদিন গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল কলকাতা থেকে অনেক লোকজন এসেছে। মহেন্দ্রনাথের বিধ্বস্ত পৈতৃক বাড়িতে বড়সড় কাজ হবে। মাস তিনেকেই পুরনো বাড়িটা সেই ধাঁচেই সেজেগুজে সুন্দর আধুনিক বাড়ি হয়ে গেল। নগেন্দ্রনাথ অল্পদিনের মধ্যে বোম্বের ডাক্তারি ছেড়ে সস্ত্রীক গ্রামে এসে বাসা বাঁধলেন। গ্রামের মানুষ বলল, যেমন বাপ তেমনি ব্যাটা। ডাক্তারের একটি ছেলে, সেও ডাক্তার, থাকে বিদেশে। লোকেরা আগে অসুবিধে হলে জেলা হাসপাতালে যেত, এখন নগেন ডাক্তারকে অনেকে দেখায়। ফিস নেন, তবে বোম্বেতে যা নিতেন তার তুলনায় হাস্যকর। অনেকের পুরনো রোগ সেরেছে। গ্রামেগঞ্জে খবর ছড়িয়ে পড়ে মুখে মুখে, অন্যান্য জায়গা থেকেও লোক আসে। অঞ্চলের মানুষ খুশি।
নগেন-সবিতাও খুব খুশি আজ, এতদিন পরে বাড়ি আবার আনন্দে ঝলমল করছে। পুত্র-পুত্রবধূ প্রত্যেক বছরের মতো এসে ফিরে গিয়েছে পাঁচ মাস হল। দু’দিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন, ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে নরেন ও অনিমা আসবে। দাদা-বৌদির আদেশ অমান্য করতে পারেনি নরেন, ছুটি নিতে হয়েছে। ঐন্দ্রিলার অবশ্য এখন ক্লাস নেই। রবিবার সকালেই বেরিয়ে পড়েছে স্ত্রী-কন্যা সমেত। সাত বছরের তফাৎ বয়সে, কিন্তু যত দিন গিয়েছে দুই ভাই ধীরে ধীরে বন্ধু হয়ে উঠেছে। সবিতা-অনিমার সম্পর্কও দুই বোনের মতোই।
সন্ধ্যেবেলায় মিলনোৎসব চলল নানা খাদ্য-পানীয় সম্ভারে। গল্প আনন্দ হাসাহাসির মধ্যে ঠিক হল পিকনিক হবে মঙ্গলবার। ত্রিশ কিলোমিটার দূরে খুব সুন্দর লেক আছে, নাম মোতিঝিল। এক সাহেব অনেক বছর আগে, এই অঞ্চলের জলকষ্ট কাটাতে বানিয়েছিলেন। অনেকে পিকনিক করতে আসে। জেলেদের মাছ ধরার নৌকা ভাড়া নিয়ে ছেলে-ছোকরারা জলবিহারও করে।
লেকের পাশে, গাছের তলায় পাতা চাদরে গা এলিয়ে নানা কথায় নরেন জিজ্ঞেস করে দাদাকে— তোমার তো মাছ ধরার হবি ছিল ছোটবেলায়।
—এখনো ধরি। একটা ছেলে আছে, মাছ ধরায় পণ্ডিত। ও যখন আসে গ্রামে, ওকে নিয়ে আসি মাছ ধরতে।
ঐন্দ্রিলা প্রশ্ন করে— মাছ ধরারও আবার পণ্ডিত হয় নাকি?
—সব কিছুর হয়।
নরেন জিজ্ঞেস করে— তোমাদের বাড়ি গাড়ি চালিয়ে যে পৌঁছে দিল, সেই ছেলে?
—হ্যাঁ। সুকুমার গাড়ি চালায় ভালো।
—ওই তো সেদিন মাছ ধরছিল। ছেলেটা স্মার্ট, সাধারণ গ্রামের ছেলেদের মতো নয়।
হেসে ওঠেন নগেন ডাক্তার— সুকুমার দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স থেকে এমএসসি পাশ করেছে। পাশের গ্রামেই পৈতৃক বাড়ি, মাকে নিয়ে প্রত্যেক বছর আসে। পিএইচডি করবে কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে।
—দিল্লি বোম্বে ব্যাঙ্গালোর ছেড়ে আসছে কলকাতায়? আশ্চর্য!
—হ্যাঁ, একটু অন্য ধরনের। চাষী, মজুরদের সঙ্গে গল্প করে, মাছ ধরে, বই পড়ে। নিজের খেয়ালে থাকে। ছেলেটা সাইন করবে।
—খ্যাপা গোছের নয় তো?
সবিতা খাবার বাড়তে বাড়তে শুনছিল, বলে,
—কথা বলে নিজেই দেখে নাও, কেমন খ্যাপা।
নগেন হাসতে হাসতে বলে— তোর বৌদির ফেভারিট, ওকে দেখলেই নাকি ছেলের কথা মনে আসে। আমার সঙ্গে দাবা খেলতে আসে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কলকাতা বাছল কেন। বলছে, ওই সাবজেক্টে কলকাতার এই ইনস্টিটিউটের খুব নাম আছে, সারা পৃথিবীতে। পিসির বাড়িতে থেকে পড়বে।
অনিমা জানতে চায়— ওর বাবা নেই?
—সুকুমারের ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন, বড় সরকারি অফিসার ছিলেন। মা কলেজে পড়ান। তাঁরও রিটায়ার দু’বছর পরে। বোধহয় কলকাতায় চলে আসবে, একটা ফ্ল্যাট বুক করেছে নিউটাউনে।
ঐন্দ্রিলা বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। বলে ওঠে— কফি তো হজম হয়ে গিয়েছে। খাবো কখন! গ্রামের খ্যাপা লোকের জীবনকাহিনীতে সময় কাটালে চলবে?
অনিমা বিরক্ত হয়।
—যেমন বাবা, তেমনি মেয়ে। চলো দিদি একটু হেঁটে আসি, খাওয়া যাবে ভালো।
দুই জা উঠে পড়ে। ঐন্দ্রিলা চেঁচায়— মা, আমি আসব?
—না।
ঐন্দ্রিলাও লেকের ধারে বেড়িয়ে আসতে একাই চলে গেল। নগেন্দ্রনাথ বলেন ভাইকে— তোর বৌদির খুব পছন্দ। ভালো পরিবার, ছেলেটা ব্রিলিয়ান্ট এবং ডাউন টু আর্থ।
ঐন্দ্রিলা যখন ঘুরে এল, ততক্ষণে সবিতা ও অনিমা ফিরে এসেছে। ফেরার সময় ওর মনে হল চারজনে গভীর আলোচনায় মগ্ন। ও কাছে আসতে কথা অন্য দিকে ঘুরে গেল। হঠাৎ কী হল এদের? অবাক হয় ঐন্দ্রিলা, কী এমন কথা থাকতে পারে যা ওর শোনার কথা নয়!
জেঠুর সঙ্গে বুধবার যখন আমবাগান দেখতে বেরিয়েছিল ঐন্দ্রিলা, সেই সময় সবিতা অনিমাকে নিয়ে গেলেন সুকুমারদের বাড়ি। সবিতার প্রস্তাবে অমত ছিল না সুকুমারের মায়ের— আপনাদের পরিবারের মেয়ে, এতো খুব সুখের কথা। তবে, এখন তো সুকু পড়াশোনা করছে।
—হ্যাঁ, ঐন্দ্রিলাও এমএ, এমফিল করবে। তিন বছর পেরিয়ে যাবে। তার মধ্যে সুকুমারের পিএইচডি শেষ হয়ে আসবে।
—ওরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলেই তো মঙ্গল।
—সে তো বটেই। আমরা চেষ্টা করতে পারি, নিষ্পত্তি তো ওদেরই।
—আপনাদের মেয়ে কিছু বলেছে কি?
—আমরা বুঝেছি, সুকুমারকে ওর ভালো লেগেছে। মেয়েকে দেখবেন?
—সুকুর যদি ভালো লেগে থাকে, তাহলেই হবে। ছেলে আমার ভুল করে না।
খুশি হয়ে বেরিয়ে আসেন দুই জায়ে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সুকুমার এল। নগেন্দ্রনাথই ডেকে পাঠিয়েছিলেন, দাবা খেলতে। নরেন্দ্রনাথ আর ঐন্দ্রিলাও তখন বসার ঘরে। সুকুমারের পরনে আজ প্যান্ট, টি-শার্ট। ঐন্দ্রিলা খেয়াল করল, ফর্মাল জামা কাপড়ে ছেলেটা অনেক বেশি হ্যান্ডসাম। কিন্তু খেলার থেকে আড্ডাতে বেশি উৎসাহ জেঠুর। খেলা বেশি এগলো না। সবিতা ও অনিমা ঘরে ঢুকল প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে। নানা কথায় বোঝা গেল সুকুমারের কাস্পারভ থেকে বিশ্বনাথ আনন্দ পর্যন্ত সব বড় খেলোয়াড়ের দাবার চাল মুখস্থ। আধুনিক ভারতীয় ইংরাজি লেখকদের অনেক বিখ্যাত লেখাই পড়া। লজ্জায় পড়েছিল ঐন্দ্রিলা যে, বাংলার আধুনিক লেখার বিষয়ে ওর জানার পরিধি কম। বাড়ি ফিরে বাংলা বই আরও পড়তে হবে।
ঐন্দ্রিলা কিছু একটা আঁচ করছিল। ওদের এখানে আসতে বলা। মা জেঠিমার ফিস-ফিস করে কথা। সুকুমারদের বাড়ি যাওয়া। জেঠুর দাবা খেলার উৎসাহ। কোনোটাই অকারণে নয়। চালাক-চতুর মেয়ে, আন্দাজ করতে অসুবিধে হয়নি। কলকাতার লরেটো স্কুলের ছাত্রী, লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে ইংরাজিতে অনার্স নিয়ে পাশ করেছে। এখন ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে এমএতে ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায়। অনেক মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে ছেলে বন্ধুও আছে। তারা সবাই স্মার্ট, আধুনিক। কিন্তু এই ধুতি, হাওয়াই চপ্পলে সজ্জিত পুকুরে মাছ ধরা ছেলেটা অন্যরকম। ঐন্দ্রিলার মজা লেগেছিল ওর কাণ্ডকারখানা দেখে। আলোড়ন শুরু হয়েছে ঐন্দ্রিলার নিজের ভেতরেও, প্রথম থেকেই। অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলতে এত ভালো কখনো লাগেনি। সুকুমারের উপস্থিতি, চোখের উদাস দৃষ্টি যেন ওকে নার্ভাস করে দেয়। লজ্জার সঙ্গে একটা মিষ্টি ভালোলাগা ঐন্দ্রিলার সারা মন ছেয়ে রেখেছে।
সুকুমার হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল দু’বার। নগেন্দ্রনাথ প্রশ্ন করলেন— তুমি কবে জয়েন করছ? সুকুমার বলল, ও কলকাতায় ফিরবে শনিবার। ইনস্টিটিউটে সেই দিনই যোগ দেবে। অনিমা বলে,
—আমরাও সেইদিনই যাব। আমাদের সঙ্গে তুমি আসতে পার। মাত্র ঘণ্টা দু’য়েকের তো রাস্তা।
সুকুমার হ্যাঁ বা না, কিছু বলে না। সবিতা বললেন— তোমার মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে, উনিই বললেন যে, তুমিও যাচ্ছ শনিবারই। ভালোই হবে, একসঙ্গে গাড়িতে গল্প করতে করতে চলে যাবে।
—ঠিক আছে।
সুকুমার মেনে নেয়। ওর সংযত সাবলীল গাম্ভীর্য ঐন্দ্রিলার খুব ভালো লাগে।
সেদিন দু’ঘণ্টার রাস্তা ঐন্দ্রিলার মনে হল, যেন বেশি তাড়াতাড়ি কেটে গিয়েছিল। স্টিয়ারিং হাতে সুকুমার ভালো শ্রোতা। নরেন্দ্রনাথ সামনের সিটে। মাকে নিয়ে ঐন্দ্রিলা পেছনে। নরেন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিল— তুমি কোথায় যাবে, পিসির বাড়ি? সুকুমার বলে— না। জয়েন করে, পরে যাব ওখানে। আপনাদের ছেড়ে ট্যাক্সি নিয়ে যাব ইনস্টিটিউটে। বাড়ির লোকেশন স্টার্ট করার সময় দিয়েছিলেন।
—তুমি ইনস্টিটিউটে নেমে পড়। আমি ওখান থেকে চালিয়ে নিয়ে যাব।
অনিমা স্নেহের সুরে বলে— সামনের উইকএন্ডে আমাদের বাড়ি এসো। রবিবার লাঞ্চে, কেমন?
ঐন্দ্রিলা আয়নায় সুকুমারের চোখে চোখ রেখে বলেছিল— আসবেন।
সুকুমার গাড়ি চালাতে ব্যস্ততার মধ্যে আংশিক মাথা নেড়েছিল।
ইনস্টিটিউটের গেটের কাছে গাড়ি যেখানে গিয়ে থামল, একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হল, মেয়েটি জানত ঠিক কোথায় গাড়িটা দাঁড়াবে। বেশ সুন্দরী, উত্তর ভারতের মেয়ে। ঐন্দ্রিলার মতোই জিন্স ও টি-শার্ট পরা। সুকুমার দরজা খুলে নামতেই, মেয়েটা ওকে দেখে দৌড়ে এসে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওর হাত জড়িয়ে ধরল। সুকুমার একটু সন্ত্রস্ত হয়ে সরে যায়। বলে— আমার বন্ধু, আয়েশা। আমরা একসঙ্গেই সেন্ট স্টিফেন্সে পড়েছি, ওর সাবজেক্ট কেমিস্ট্রি। এখানেই পিএইচডি করবে।
নরেন গাড়ি ছাড়ল। নিজেদের গড়া স্বর্গ থেকে নির্বাসিত তিনজন মানুষ যন্ত্রের মতো হাত নাড়ল। দুটো অভিজ্ঞ মুখে পোশাকি হাসি, কিন্তু চোখ সে হাসি ছোঁয়নি। নিজের বোকামিতে, হতাশায়, দুঃখে, অপমানে তরুণী চোখ দুটো প্রায় ভিজে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওর মোবাইল ফোনটাও বাজল। ঐন্দ্রিলার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী জানতে চেয়েছিল,
—কলকাতায় পৌঁছে গিয়েছিস? আজ বাড়ি আসবি?
—হ্যাঁ পৌঁছেছি। তবে মাথাটা একটু ধরেছে। আজ থাক, কাল যাব।
Advertisement



