সুভাষচন্দ্র বাগ
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও তথাকথিত উন্নয়নমুখী সমাজব্যবস্থায় দাঁড়িয়েও আজকের যুবসমাজ এক গভীর অনিশ্চয়তার সংকটে আবদ্ধ। শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে বেকারত্বের কঠিন বেড়াজালে। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম, উদ্যমী ও সম্ভাবনাময় সময়ে দাঁড়িয়েও আজ লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী কর্মহীনতার যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়—এটি সামাজিক, মানসিক ও জাতীয় অগ্রগতির পথের অন্যতম প্রধান অন্তরায়।
Advertisement
আজকের দিনে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, ডিগ্রিধারীর সংখ্যাও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। যে তরুণরা একসময় পরিবার ও সমাজের আশার আলো ছিল, তারা আজ সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি ও অনলাইন পোর্টালে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি স্থায়ী কাজের আশায়। চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ পেলেই লক্ষাধিক আবেদন জমা পড়ে, যা থেকে স্পষ্ট হয় সমস্যার গভীরতা।
Advertisement
বেকারত্বের প্রভাব শুধুমাত্র আর্থিক অভাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মহীনতা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষয় করে দেয়। অনেক তরুণ হতাশা, অবসাদ ও আত্মগ্লানিতে ভুগতে শুরু করে। পরিবারের উপর নির্ভরশীল থাকা, সমাজে নিজেকে ব্যর্থ মনে করার অনুভূতি তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এই মানসিক চাপে অনেক সময় তরুণরা ভুল পথে পা বাড়ায়, অপরাধ ও নেশার মতো সামাজিক ব্যাধিতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাও এই সংকটের জন্য অনেকাংশে দায়ী। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও পরীক্ষানির্ভর ও তত্ত্বভিত্তিক পাঠ্যক্রমে আবদ্ধ, যেখানে বাস্তবমুখী দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র দুর্বল। ফলস্বরূপ ডিগ্রি থাকলেও বহু তরুণ চাকরির উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। শিল্প ও শিক্ষার মধ্যে এই ব্যবধানই আজ বেকারত্বের অন্যতম মূল কারণ।
শহর ও গ্রামের মধ্যেও বেকারত্বের প্রভাব ভিন্নভাবে দেখা যায়। শহরে যেখানে প্রতিযোগিতা বেশি, সেখানে গ্রামে সুযোগের অভাব আরও প্রকট। গ্রামীণ যুবসমাজ কৃষিনির্ভর জীবিকা ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে, কিন্তু শহরও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারছে না। এর ফলে বস্তি সম্প্রসারণ, অনিয়মিত শ্রম ও অনিশ্চিত জীবিকার সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
সরকারি নীতি ও কর্মসংস্থান প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও বাস্তব প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, স্টার্টআপ প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তার সুফল সব যুবকের কাছে পৌঁছচ্ছে না। তথ্যের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে অনেক প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে যুবসমাজের হতাশা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই, তা ধীরে ধীরে সামাজিক অসন্তোষে রূপ নিচ্ছে। আন্দোলন, প্রতিবাদ ও ক্ষোভের প্রকাশ বাড়ছে। কর্মসংস্থানহীন এক প্রজন্ম দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো আছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অনেক তরুণ নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাচ্ছে।
ই-কমার্স, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার পরিষেবা প্রভৃতি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ পেলে যুবসমাজ নিজেরাই কর্মসংস্থানের স্রষ্টা হয়ে উঠতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ বৃদ্ধি, গ্রামীণ শিল্পায়ন ও স্বনির্ভর প্রকল্পের বিস্তার অপরিহার্য। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
বেকারত্বের বেড়াজাল থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার— তিন পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। আজকের যুবকরাই আগামী দিনের নির্মাতা। তাদের শক্তি ও সম্ভাবনাকে যদি কর্মসংস্থানের সঠিক পথে পরিচালিত করা যায়, তবে বেকারত্বের অন্ধকার কাটিয়ে একটি আত্মনির্ভর, শক্তিশালী ও উন্নত জাতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এই বেকারত্বের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব শুধু বর্তমান প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনবোধ ও স্বপ্নকেও প্রভাবিত করছে। আজ যে তরুণ কর্মহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, আগামী দিনে তার সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করার সামর্থ্যও ক্ষীণ হয়ে পড়বে। এর ফলে একটি দারিদ্র্যচক্র তৈরি হচ্ছে, যা সমাজের নিম্নস্তরে আটকে থাকা মানুষদের উন্নয়নের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে জাতির সামগ্রিক অগ্রগতি ব্যাহত হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
বেকারত্বের কারণে গ্রাম থেকে শহরে যে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন বাড়ছে, তা শহরের পরিকাঠামোর উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। আবাসন সংকট, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ শহুরে জীবনের মান ক্রমশ অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে করে সামাজিক বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠছে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে।
নারী-যুবসমাজের ক্ষেত্রে বেকারত্বের প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। বহু শিক্ষিত তরুণী শুধুমাত্র নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও উপযুক্ত সুযোগের অভাবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারছেন না। সামাজিক রক্ষণশীলতা, যাতায়াতের অসুবিধা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য তাদের পিছিয়ে রাখছে। ফলে জাতির অর্ধেক শক্তি কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থেকে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি বড় অন্তরায়।
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বাজারও আজ একটি নতুন ধরনের বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। কোচিং সেন্টার, গাইডবুক, অনলাইন কোর্স— সব মিলিয়ে এক বিশাল শিল্প গড়ে উঠেছে, যেখানে হাজার হাজার তরুণ শেষ সঞ্চয় দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে চাকরির সংখ্যা সীমিত থাকায় অধিকাংশই বারবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হচ্ছে। এতে করে হতাশা ও আত্মগ্লানি আরও গভীর হচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষতা ও শ্রমের মূল্যহ্রাস। অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক কাজ, গিগ ইকোনমি ও দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরতা যুবসমাজকে স্থায়ী নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। স্থায়ী চাকরির অভাব তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, যেমন— বিবাহ, বাড়ি কেনা, সন্তানের শিক্ষা—এসবকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
গ্রামীণ স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্পের পুনরুজ্জীবন এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে। স্থানীয় সম্পদের সদ্ব্যবহার করে যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তবে শহরমুখী চাপ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ও হস্তশিল্পের উন্নয়ন গ্রামীণ যুবসমাজের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বেকারত্ব কেবল একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়— এটি একটি নীরব সামাজিক দুর্যোগ। এই দুর্যোগের সবচেয়ে বড় শিকার আজকের যুবসমাজ। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে এই প্রজন্মের হতাশা আগামী দিনের জাতীয় উন্নয়নের পথে এক ভয়ংকর অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। তাই সময় এসেছে কথার বাইরে এসে বাস্তব কর্মসূচির মাধ্যমে যুবসমাজকে কর্মের মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার।
Advertisement



