• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 3 June, 2026

ভারতের উপর আবার অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর প্রস্তাব আমেরিকার

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতের পণ্যের উপর ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসতে পারে

দিল্লির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ভারত-সহ মোট ৬০টি দেশের উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভারতের পণ্যের উপর ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, ভারত বলপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য আইনের ‘সেকশন ৩০১’-এর আওতায় করা তদন্তের ভিত্তিতেই এই সুপারিশ করা হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তরের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-সহ ৫৪টি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমন কোনও কার্যকর নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি, যা বলপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি বন্ধ করতে সক্ষম হয়।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের দাবি, এই ধরনের ব্যর্থতা আমেরিকার শ্রমিকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে। তাঁর কথায়, বলপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।   প্রসঙ্গত, বলপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বলতে এমন পণ্যকে বোঝায়, যা শ্রমিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে, জোর করে, ঋণের ফাঁদে ফেলে বা চলাফেরার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে কাজ করিয়ে উৎপাদন করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কাজ না করেন এবং শাস্তি, হুমকি বা চাপের কারণে কাজ করতে বাধ্য হন, তাহলে সেটিকে বলা হয় ফোর্সড্ লেবার বা বলপূর্বক শ্রম।

মার্কিন প্রশাসনের প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশ বলপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত পণ্যের আমদানির ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ইকুয়েডর। অন্যদিকে, যেসব দেশ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেনি, তাদের জন্য ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত, চিন, জাপান, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, সৌদি আরব-সহ ৫৪টি অর্থনীতির জন্য ১২.৫ শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিযোগ আসলে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ভারত বলপূর্বক শ্রম দিয়ে পণ্য তৈরি করছে’ এমন নয়। তাদের বক্তব্য হল, ভারত বিদেশ থেকে আমদানি হওয়া জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের প্রবেশ রোধে যথেষ্ট কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই কারণেই তারা সেকশন ৩০১ তদন্তের আওতায় অতিরিক্ত শুল্কের প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে দিল্লি এই অভিযোগ মানতে নারাজ। কেন্দ্রীয় সরকারের মতে, বিষয়টি নিয়ে একতরফা পদক্ষেপের বদলে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা উচিত। ভারত ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের কাছে তদন্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপের পেছনে শুধু শ্রম-ইস্যু নয়, বৃহত্তর বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলও কাজ করছে। ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, তদন্তের মূল প্রশ্ন ছিল ভারত বিদেশ থেকে আসা বলপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত পণ্যের আমদানি রোধ করছে কি না। ভারতের নিজস্ব রপ্তানি উৎপাদনে এমন শ্রম ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা নয়। ফলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনি ও কূটনৈতিক বিতর্কের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

আমেরিকার এই প্রস্তাব এমন সময়ে সামনে এল যখন ভারত ও আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। চলতি মাসের শুরুতে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা শুল্ক কমানো, বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক বাধা দূর করার লক্ষ্যে বৈঠকে বসেছেন। এরই মধ্যে নতুন শুল্কের প্রস্তাব আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত এই নিয়ে জনমত গ্রহণ করবে। ৭ জুলাই এই বিষয়ে শুনানি হবে। তারপরই মার্কিন প্রশাসন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।তবে একথা বলা যায় যে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আবহে বিশ্বব্যাপী যে সঙ্কটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ভারতের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।