পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর এবং হু-হু করে কমছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। সেই অসহনীয় অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে শিক্ষা ও জনপরিষেবায় সরকারি ব্যয় সঙ্কোচের ক্ষোভ মিশে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা। প্যারিস, মিলান, ব্রাসেলস, লিসবন এবং তিরানার রাজপথ পেরিয়ে সেই বিক্ষোভের আঁচ পৌঁছে গিয়েছে আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন মুলুকেও। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির চোখে অক্টোবর মাসের এই উত্তাল সময়কাল চিহ্নিত হচ্ছে ‘ক্রোধের মরশুম’ (Season of Anger) হিসেবে। কোথাও মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের পেট্রল বোমায় পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভবন, কোথাও আবার বিলাসবহুল বিপণিতে চলছে অবাধ লুটপাট আর পুলিশের জলকামান-কাঁদানে গ্যাসের পাল্টা আক্রমণ।
ফ্রান্সে ছাত্রক্ষোভ থেকে অগ্নিগর্ভ গণবিদ্রোহ
ইউরোপের এই গণবিক্ষোভের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং বিধ্বংসী চেহারা দেখা গিয়েছে ফ্রান্সে (France cost of living protests)। মূলত গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসের শহরতলি ক্রেতেইলের একটি হাই স্কুল থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। স্কুলে শিক্ষকের অভাব, জরাজীর্ণ পরিকাঠামো এবং কলেজ ভর্তির অনলাইন পোর্টাল ‘পারকুরসুপ’-এর জটিলতার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল কিশোর পড়ুয়ারা। এক মাসের মধ্যে সেই ছাত্র আন্দোলন মিশে গিয়েছে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়ন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ গোষ্ঠীর দেশজোড়া ডাকে।
Sayang banget ya, kantor walikota bersejarah berusia lebih dari 140 tahun di Limoges, Prancis, lenyap dikabar warga yg ladi demo Demo besar pecah di Prancis, 17 Okt 2026, karena kemarahan rakyatnya soal inflasi, harga2 naik, gaji jalan di tempat, utang publik terhadap PDB mengkhawatirkan 🎥: Paris Match
— sosmed keras (@sosmedkeras) October 18, 2026
শনিবার প্যারিস, মার্সেই, বর্দো, রেন এবং তুলুজ-সহ গোটা দেশে পাঁচ থেকে আট লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন। শান্তিপূর্ণ মিছিল দ্রুতই পরিণত হয় গত কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গায়। লিমোজ শহরে মুখোশধারী দাঙ্গাকারীরা ১৪৩ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক টাউন হলে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। দু’টি বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা সহ্য করে টিকে থাকা সেই স্থাপত্যের বড় অংশই আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে। প্যারিস এবং বর্দোয় অ্যাপল, লুই ভিতোঁ, হার্মেস, ল্যাকোস্ত এবং নাইকির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের শোরুম ভেঙে অবাধে লুটপাট চালানো হয়। প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার জানিয়েছেন, রাজধানীর একাধিক রাস্তা আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ১,২০০-র বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করেছে। ব্রাসেলস থেকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ শান্তির আবেদন জানালেও, আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মুখে দক্ষিণপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন দাঙ্গাকারীদের দমনে পুলিশকে আরও চরম ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তুলেছেন। ফরাসিদের এই দুর্দিনে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিদ্রূপের সুরে তিনি বলেছেন, ফ্রান্স বরাবরই বিপ্লবের জন্য চমৎকার জায়গা, চলুন ফ্রান্সে গিয়ে বিপ্লবে শামিল হওয়া যাক।
মিলানে লুটপাট, ব্রাসেলসে জলকামান
ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী ইতালি, বেলজিয়াম এবং পর্তুগালেও (European street riots)। শনিবার ইতালির মিলান শহরে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইতালিয়া ইন পিয়াৎসা’ মঞ্চের ডাকে বিশাল মিছিল বেরোয়। ঐতিহাসিক মিলান ক্যাথেড্রালের সামনে পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে জনতা। দোকানপাট লুটপাট শুরু হলে আতঙ্কে পর্যটকেরা পালাতে শুরু করেন এবং ডুওমো মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দিতে হয়। বোলোনিয়া শহরেও জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। দুই শহর মিলিয়ে বহু নাবালক-সহ প্রায় ষাট জনকে আটক করা হয়েছে।
একই ছবি দেখা গিয়েছে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস এবং লিয়েজ শহরে। সেখানেও শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভ হিংসাত্মক চেহারা নেয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে চেয়ার ও পাথর ছোড়া হলে পাল্টা জলকামান, কাঁদানে গ্যাস এবং পেপার স্প্রে ব্যবহার করে দাঙ্গা পুলিশ। তুলনায় শান্তিপূর্ণ হলেও পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রাজপথে শনিবার পা মিলিয়েছিলেন কয়েক লক্ষ মানুষ। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, চড়া গৃহঋণের সুদ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মধ্য-দক্ষিণপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলেন সাধারণ শিক্ষক থেকে শুরু করে ট্রাকচালকেরা। স্পেনের মাদ্রিদেও আবাসন সংকটের সুরাহা চেয়ে রাস্তায় তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান চালাচ্ছেন নাগরিকেরা।
রণক্ষেত্র তিরানা
পশ্চিম ইউরোপের পাশাপাশি বলকান দেশ আলবেনিয়াতেও গত তিন দিন ধরে চলছে তীব্র গণবিক্ষোভ। টানা তেরো বছর ক্ষমতায় থাকা সমাজতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগের দাবিতে রাজধানী তিরানার রাজপথ দখল করেছে ছাত্র-যুবরা। সরকারি দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার খরচ বৃদ্ধির ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে একটি বিতর্কিত পর্যটন প্রকল্প। সংরক্ষিত উপকূল এবং জনমানবহীন সাজান দ্বীপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনারের মদতপুষ্ট একটি বিলাসবহুল রিসর্ট তৈরির ছাড়পত্র দিয়েছে রামা সরকার।
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ ধ্বংসের আশঙ্কায় গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ইতিমধ্যেই ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’ নাম পেয়েছে। তিরানার ‘কলেজ অব ইউরোপ’ প্রাঙ্গণে পেট্রল বোমা ছোড়া হয়েছে, ভাঙচুর চলেছে একাধিক ব্যাঙ্ক ও সরকারি দফতরে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৬১ জন পুলিশকর্মী-সহ অন্তত ৮৯ জন আহত হয়েছেন। তবুও পদত্যাগের দাবি উড়িয়ে দিয়ে এই অস্থিরতার পিছনে বিদেশি শক্তির হাত দেখছেন প্রধানমন্ত্রী রামা।
আমেরিকায় নো কিংস অভিযান
ইউরোপের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সমান্তরালে শনিবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আমেরিকার রাজপথও। আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ‘নো কিংস’ (No Kings US protests) জোটের ডাকে ওয়াশিংটনের লিঙ্কন মেমোরিয়াল থেকে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন এবং আটলান্টায় রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদিখানার জিনিস ও চিকিৎসার অস্বাভাবিক খরচ, প্রশাসনের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা, অভিবাসন দফতরের ধরপাকড় এবং নির্বাচনে ধনকুবেরদের টাকার খেলার প্রতিবাদে সরব হন মার্কিন নাগরিকেরা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ থেকে আমেরিকা কিংবা ভারতের দিল্লিতে চলা সাম্প্রতিক নাগরিক ও ছাত্র আন্দোলন– প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্ষোভের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’। যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ যে বিশ্বজুড়েই ভাঙতে শুরু করেছে, অক্টোবরের এই গণবিক্ষোভের ঢেউ তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।




