• facebook
  • twitter
Friday, 30 January, 2026

আফগানিস্তান সীমান্ত বন্ধে আর্থিক ধাক্কা পাকিস্তানে

ভয়াবহ ক্ষতির মুখে খাইবার পাখতুনখোয়া

আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়েছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে সীমান্ত পারাপার ও বাণিজ্য স্থগিত থাকার ফলে প্রদেশটির রাজস্ব আয় কমেছে প্রায় ৫৩.০২ শতাংশ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে ফেডারেল সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছে প্রাদেশিক প্রশাসন।

পাকিস্তানের শীর্ষ দৈনিক সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম সাত মাসে ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট সেস’ (আইডিসি) আদায় নেমে এসেছে ৭.৪২ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি থেকে মাত্র ৩.৪৮ বিলিয়ন রুপিতে। অর্থাৎ সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পাক সরকারের কোষাগারে।

Advertisement

খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা মুজাম্মিল আসলাম ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামালের কাছে চিঠি লিখে জরুরি বৈঠকের আবেদন জানিয়েছেন। ওই বৈঠকে প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় স্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গিয়েছে। বৈঠকে রাজস্ব ক্ষতি, ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকট, আটকে থাকা পণ্য, সীমান্তের দু’পাশে আটকে থাকা অর্থপ্রদান এবং কর্মসংস্থানের উপর পড়া প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা।

Advertisement

আসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত বন্ধ থাকায় শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান— সব মিলিয়ে ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব পড়ছে খাইবার পাখতুনখোয়ায়। তিনি বলেন, প্রথম দিকে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সেস আদায়ে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, যা নভেম্বরে মিটে যায়। কিন্তু তার পরেও বাণিজ্য চালু না হওয়ায় কোনও পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পণ্য ও অর্থ সীমান্তের দু’পাশেই আটকে রয়েছে। বহু ব্যবসায়ী সেস দেওয়ার মতো আর্থিক অবস্থাতেও নেই।

প্রসঙ্গত, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ। দুই দেশের সীমান্তে পাক সেনা ও তালিবানের মধ্যে টানা আট দিনের সংঘর্ষের পর থেকেই সীমান্ত পারাপার বন্ধ হয়ে যায়। একাধিক দফায় কূটনৈতিক আলোচনা হলেও এখনও সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়নি।

এর জেরে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি খাইবার পাখতুনখোয়ার লান্ডি কোটাল এলাকায় তোরখাম সীমান্ত খোলার দাবিতে বড়সড় প্রতিবাদ আন্দোলন হয়। ‘অল বর্ডারস কো-অর্ডিনেটরস কাউন্সিল’-এর ডাকে ওই আন্দোলনে অংশ নেন ব্যবসায়ী, পরিবহণ শ্রমিক, উপজাতীয় নেতা, দিনমজুর, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

বক্তারা বলেন, সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষের ‘অর্থনৈতিক হত্যা’ হচ্ছে। বিশেষ করে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষ সম্পূর্ণভাবে সীমান্ত বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাঁদের দাবি, তোরখাম সীমান্ত শুধু একটি সীমান্ত চৌকি নয়, এটি মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এবং হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু।

বিক্ষোভকারীরা জানান, সীমান্ত বন্ধ থাকায় গোটা এলাকার বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বহু পরিবার চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। অনেকেই বেঁচে থাকার জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা পাকিস্তান ও আফগানিস্তান— দুই দেশের সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, যেন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ইস্যুর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও বাণিজ্যকে যুক্ত না করা হয় এবং সীমান্ত খুলে দিয়ে মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা পুনরায় চালু করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত বন্ধ থাকলে খাইবার পাখতুনখোয়ার মতো সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলিতে শুধু রাজস্ব ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সঙ্কট আরও গভীর হবে। তাই দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান ও কূটনৈতিক উদ্যোগই এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর একমাত্র উপায়।

Advertisement