গত বছরের ডিসেম্বর মাসের শেষে মারা যান বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এবার তাঁর মৃত্যু নিয়ে উঠল ‘ইচ্ছাকৃত গাফিলতি’র অভিযোগ। আর সেই অভিযোগ তুললেন খালেদার চিকিৎসায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক-চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।’ তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণ জেনেও একটি ওষুধ দিনের পর দিন খাওয়ানো হয়েছিল। যা একপ্রকার পরিকল্পনা করে বিষ প্রয়োগের সমান বলে অভিযোগ করেছেন সিদ্দিকী। শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় নাগরিক সমাজ আয়োজিত খালেদা জিয়ার স্মরণসভায় এই অভিযোগ করেন চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকী।
৮০ বছরের বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ডায়াবিটিস, আর্থাইটিস, কিডনি, লিভার, হৃদ্রোগ, ফুসফুস, দৃষ্টি সংক্রান্ত একাধিক রোগে দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছিলেন। গত বছর চিকিৎসার জন্য তাঁকে লন্ডনেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শুক্রবার ঢাকায় খালেদার শোকসভায় চিকিৎসক সিদ্দিকী বলেন,‘আমাদের তত্ত্বাবধানে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে আমরা অত্যন্ত বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করি, ম্যাডাম লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত। অথচ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসার ছাড়পত্রে তাঁর জন্য আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় মেথোট্রেক্সেট নামের একটি ট্যাবলেট নিয়মিত সেবনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং ভর্তি থাকা অবস্থাতেও তাঁকে এই ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ওষুধটি বন্ধ করে দিই।’
Advertisement
মেডিক্যাল টিম প্রধানের কথায়, ওই ওষুধটি দিনের পর দিন খেলে লিভারের সমস্যা হতে পারে তার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। অথচ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর লিভারের কার্যকারিতার পরীক্ষা এবং ইউএসজি করে লিভারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়নি। এভার কেয়ার হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে খালেদা জিয়ার লিভারের অবস্থা ভালো নয়। উল্লেখ্য, সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসার সময় খালেদা জিয়া তাঁর চিকিৎসক দলে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের যুক্ত করতে চেয়ে আদালতে শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
Advertisement
ঢাকার মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। যার পরিচালনার দায়িত্বে বর্তমানে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার। খালেদার ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসকদলের প্রধান মূলত পূর্ববর্তী শাসক শেখ হাসিনার সরকারের দিকে আঙুল তুলতে চেয়েছেন। খালেদা জিয়া ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড–১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে একটি মেডিক্যাল বোর্ড তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। সে সময় থেকেই সিদ্দিকী খালেদার চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। ৩০ ডিসেম্বর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিলের আগে ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন খালেদা। সিদ্দিকীর অভিযোগে, সে সময়ই ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ হয়েছিল।
খালেদার মৃত্যুর পরেই তাঁকে ‘স্লো পয়জন’ করার অভিযোগ তুলেছিলেন বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ। সেই অভিযোগে কার্যত সিলমোহর দিলেন চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘মেথোট্রেক্সেট সেই ওষুধ, যেটা তাঁর ফ্যাটি লিভার অসুখ বাড়িয়েছিল এবং লিভার সিরোসিসে নিয়ে গিয়েছিল। এটা তাঁর লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’ ছিল।’ এর পরেই তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং খালেদা হত্যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ছাড়া তাঁর ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে রয়েছে।’
চিকিৎসক এফএম সিদ্দিকীর ওই সভায় খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান এবং তার স্ত্রী ও কন্যা সহ বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক সিদ্দিকী সরকারি হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁর দাবি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভুল চিকিৎসার নথিপত্র তাঁদের কাছে রয়েছে। কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন তিনি। যেমন, প্রথমত সরকার গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য কারা ছিলেন এবং কোন দক্ষতার ভিত্তিতে তাঁরা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায় তাঁদের উপর বর্তায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। দ্বিতীয়ত, কোন কোন চিকিৎসক তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন এবং অবহেলার প্রমাণ খতিয়ে দেখা। তৃতীয় এবং সর্বশেষ হল, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসার সময় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তা কেন করা হয়নি এবং কারা বাধা দিয়েছিল সেটি খতিয়ে দেখতে বলেছেন চিকিৎসক সিদ্দিকী।
Advertisement



