শনিবার ভোর রাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বিস্তীর্ণ এলাকা। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমাবর্ষণের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রথমে এই হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, এই হামলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমেরিকা। পাশাপাশি এই অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরসকে বন্দি করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলা এবং সেখানকার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।’ তাঁর আরও দাবি, ‘প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনা এবং আইন দপ্তরের যৌথ অভিযানে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, খুব শীঘ্রই সাংবাদিক সম্মেলন করে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
Advertisement
তবে এই দাবি নিয়ে এখনও পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা সরকারের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। উলটে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যে কোনও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশ রুখে দাঁড়াবে।’ এই বক্তব্যের পর লাতিন আমেরিকা জুড়ে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল।
Advertisement
প্রসঙ্গত, এদিন স্থানীয় সময় রাত প্রায় ২টা নাগাদ আকাশ থেকে খুব নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমানের শব্দ শোনার পর অন্তত সাতটি বিস্ফোরণ ঘটে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিস্ফোরণের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয় এবং উড়োজাহাজের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তাও নিশ্চিত করা যায়নি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতের এই বিস্ফোরণের পর আতঙ্কিত মানুষজন বিভিন্ন এলাকায় ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। আল জাজিরা জানিয়েছে, বিস্ফোরণগুলি মূলত কারাকাসের প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফরচুনা এলাকার আশপাশে ঘটেছে। বিস্ফোরণের জেরে ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও দেখা দিয়েছে।
একদিন আগেই ভেনেজুয়েলা সরকার জানায়, তারা মাদক পাচার দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন মাদকবিরোধী অভিযানের অজুহাতে তাঁর সরকারকে উৎখাত করতে এবং দেশের বিপুল তেল সম্পদের দখল নিতে চাইছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোর সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকারকে বরাবরই ‘অবৈধ’ বলে দাবি করে এসেছে ওয়াশিংটন। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে বিপুল মার্কিন সেনা মোতায়েন সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে। মাদুরো আগেও অভিযোগ করেছিলেন, ‘মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থা বদলাতে চাইছে আমেরিকা।’ নতুন বছরের শুরুতেই কারাকাসে বিস্ফোরণের ঘটনায় সেই অভিযোগ আরও জোরালো হল।
প্রসঙ্গত, গত মাসেই ভেনেজুয়েলা ও সংলগ্ন অঞ্চলের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় তেল ট্যাঙ্কার চলাচলের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেলের ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে। দৈনিক প্রায় দশ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন হলেও চিন ও রাশিয়ার সঙ্গে মাদুরো সরকারের ঘনিষ্ঠতা ওয়াশিংটনের অস্বস্তির প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কয়েকদিন আগেই ভেনেজুয়েলার একটি বন্দরে হামলার অভিযোগ উঠেছিল আমেরিকার বিরুদ্ধে। তখন দাবি করা হয়েছিল, ওই বন্দর ব্যবহার করে মাদক পাচার হচ্ছিল এবং সেই কারণেই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে কারাকাসে বোমাবর্ষণ ও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকেই নজর গোটা বিশ্বের।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বড়সড় সামরিক মোতায়েনের নির্দেশ দেন এবং মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ভেনেজুয়েলার আশপাশে জাহাজ ও নৌকায় হামলা চালানো শুরু হয়। এমনকি প্রয়োজনে স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে, যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে।
Advertisement



