একদিকে যখন ৭০-৮০ কোটি টাকা খরচ করে ব্রাজিলের ফুটবল দলকে ভারতে নিয়ে এসে খেলানোর উদ্যোগ চলছে, অন্যদিকে, তখন ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে ধস অব্যাহত। গত মরসুমে দেশের এক নম্বর ফুটবল লিগ আইএসএল (ISL) কোনোরকমে শেষ করেছিল সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন। কার্যত অর্ধেক লিগ খেলে চ্যাম্পিয়নের খেতাব জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল এফসি।
এ বার অনেক টালবাহানার পর ক্লাবদের জোট আইএসএল (ISL) চালাবে, এমনই সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই জোট থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে সবাইকে চমকে দিল জামশেদপুর এফসি। শুক্রবার তারা জানিয়ে দেয় আইএসএল (ISL) থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছে তারা।
রিলায়্যান্স শিল্পগোষ্ঠি ফেডারেশনের পাশ থেকে সরে যাওয়ার পর থেকে অর্থ ও সঠিক সংগঠনের অভাবে দেশের ক্লাব ফুটবলে যে ধস নামতে শুরু করেছিল, জামশেদপুর এফসি-র এই সিদ্ধান্ত সেই ধসের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিল বলা যায়। ৫৫ লাখ টাকার পার্টিসিপেশন ফি-র কিস্তি সময়মতো দিতে না পারায় তারা নাকি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল, এমনটাই জানা গিয়েছে।
কিন্তু দেশের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠি টাটার অধীনে চলা এই ক্লাব যেখানে গত দশ বছর ধরে কয়েকশো কোটি টাকা ব্যয় করে ক্লাব চালিয়েছে, তারা মাত্র ৫৫ লাখ টাকার জন্য দেশের এক নম্বর ফুটবল লিগ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেবে, এ কথা অনেকেই বিশ্বাস করছেন না।
এই তত্ত্ব বিশ্বাস করতে রাজি নন এই ক্লাবের সমর্থকেরা, যারা এত বছর ধরে ইস্পাতনগরীর দলের জন্য গলা ফাটিয়েছেন, ‘রেড মাইনার্স’ নামে নিজেদের একটি সংগঠনও তৈরি করেছিলেন তাঁরা। দল যেমনই খেলুক না কেন, লিগ তালিকায় যেখানেই থাকুক জে আরডি টাটা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ১৪ হাজার আসন প্রতি ম্যাচে ভরিয়ে রাখতেন তাঁরা। ক্লাব কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি মর্মাহত হয়েছেন তাঁরাই।
জানা গিয়েছে, গত রাতে ডিনারের আগে খেলোয়াড়দের হঠাৎ জানিয়ে দেওয়া হয় এই সিদ্ধান্ত। তাতে প্রবল হতাশ হয়েছেন ক্লাবের সেই সব খেলোয়াড়েরা, যাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বহাল ছিল। এমন জনাদশেক ফুটবলার রয়েছেন ক্লাবে। বাকিদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে অগাস্টেই। তারা হয়তো ইতিমধ্যে নতুন ক্লাব খুঁজেও নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, সবার বকেয়া অর্থ যথার্থ ভাবে মিটিয়ে দেওয়া হবে।
কিন্তু কেন নিজেদের সরিয়ে নিল জামশেদপুর এফসি?
গত বছর যখন আইএসএলের ভবিষ্যৎ চরম প্রশ্নের মুখে পড়েছিল, আদৌ লিগ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল, তখনও সমানে ফেডারেশনের পাশে থেকে তাদের ভরসা জুগিয়ে গিয়েছিল জামশেদপুর। অন্যান্য ক্লাবেরা যখন টালবাহানা করছিল, তখন একমাত্র ইস্পাতনগরীর দলই জানিয়ে দেয়, আইএসএল যেমন ভাবেই হোক, তারা খেলবে। ফেডারেশনের কোনো পদক্ষেপেই তাদের কোনো আপত্তি নেই। সেই ক্লাব এ মরসুমে সবার আগে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছেন।
ওয়াকবহাল মহলে কারো ধারণা পার্টিসিপেশন ফি-র ৫৫ লাখ টাকার কিস্তি সময়মতো না দিতে পারায় ফেডারেশন বেশ কড়া ভাষায় ক্লাব কর্তৃপক্ষকে যে চিঠি দিয়েছিল, সেই চিঠি পেয়েই ক্লাবকর্তারা নিজেদের অসন্মানিত বোধ করে এবং এই চরম সিদ্ধান্ত নেয়। এই চিঠিতে ফেডারেশন সচিব নাকি কার্যত হুমকি দিয়ে লিখেছিলেন, ২১ জুলাইয়ের পর থেকে দিনপ্রতি এক লক্ষ টাকা করে ‘লেট ফি’ দিতে হবে ক্লাবকে। না দিতে পারলে তাদের লিগ থেকে বের করে দেওয়া হবে। এই চিঠির কড়া ভাষাই নাকি মেনে নিতে পারেননি ক্লাব কর্তারা।
ক্লাবের একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, গত দু’বছরে ক্লাবের প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪-২৫ মরসুমে (রিলায়্যান্স থাকাকালীন শেষ বছরে) তারা যেখানে ২১ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা পেয়েছিল সেন্ট্রাল রাইট বাবদ, সেখানে গত মরসুমে (রিলায়্যান্স সঙ্গ ত্যাগ করার পর) সেই আয় দাঁড়ায় মাত্র ৩২ লক্ষ টাকা। লিগে ম্যাচের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাদের টিকিট বিক্রি থেকে আয়ও অনেক কমে যায়। ২০২৪-২৫-এ যা ছিল ৫৫ লক্ষ টাকা, গত মরসুমে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২১ লক্ষ টাকা, যা অর্ধেকেরও অনেক কম। সব মিলিয়ে ২৪-২৫ মরসুমে যেখানে ক্লাবের আয় হয়েছিল ৫৪ কোটি টাকারও বেশি, সেখানে গত মরসুমে সেই আয় কমে দাঁড়ায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যে অন্যতম কারণ হতে পারে এটিও।
কিন্তু যেখানে সব ক্লাবগুলিই ক্ষতির সন্মুখীন হয়েই গত বছর আইএসএলে (ISL) খেলেছে এবং এ বছর সেই ক্ষতি কিছুটা হলেও পূরণ করার আশায় এই লিগে খেলতে রাজি হয়েছে, সেখানে হঠাৎ টাটার মতো ধনী সংস্থার অধীনে থাকা ক্লাব কেন আর্থিক কারণে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল, তা অনেকেরই বোধগম্য হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ফেডারেশনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়াকেও সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করছেন অনেকে।
এর মধ্যে অবশ্য আর এক ক্লাব ইন্টার কাশী, দেরিতে হলেও তাদের পার্টিসিপেশন ফি-র প্রথম কিস্তি মিটিয়ে দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে দিনপ্রতি যে এক লক্ষ টাকার লেট ফি দিতে বলা হয়েছিল তাদের, তা দেয়নি তারা। বরং সেই ‘জরিমানা’ মকুব করার আবেদন জানিয়েছে ফেডারেশনের কাছে।
এখন একটাই প্রশ্ন, জামশেদপুরের জায়গায় তা হলে কারা এই লিগে অংশ নেবে? গত বছর ইন্ডিয়ান ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ডায়মন্ড হারবার এফসি কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রানার্স আপ শিলং লাজং এফসি-ও জানিয়ে দিয়েছে অর্থের অভাবে তারা আইএসএলে অংশ নিতে পারবে না। কলকাতার মহমেডান এসসি জানিয়েছিল, তারা আইএসএলে (ISL) অংশ নিতে চেয়ে ফেডারেশনের কাছে আবেদন জানিয়েছে। প্রয়োজন হলে তারা এ জন্য আদালতেও যাবে। গত মরসুমে চার্চিল ব্রাদার্সও পিছনের দরজা দিয়ে আইএসএলে খেলার অনেক চেষ্টা করেছিল। তারা ফের সেই উদ্যোগ নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোন বিকল্প নিয়ে এগোবে ফেডারেশন, সেটাই দেখার।




