বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির গল্প বোধহয় আর শেষই হবে না। বরং বয়স যত বাড়ছে, ততই তিনি নতুন নতুন ইতিহাস লিখে চলেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে শেষ ৩২-এ তোলার পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মহাতারকা।
এটি মেসির রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। অনেকেই ভেবেছিলেন, ৩৮ বছর বয়সে কি আর আগের মতো খেলতে পারবেন তিনি? কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ঠিক উল্টো। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকের পর অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে আরও দুটি গোল করে তিনি বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৮-তে নিয়ে গেলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এখন এককভাবে বসে রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়কই।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে মেসিকে কেন্দ্র করেই পুরো দলটা খেলে। সতীর্থরা দৌড়ঝাঁপ, প্রেসিং এবং ডিফেন্সের বড় অংশ সামলে নেন, যাতে মেসি অ্যাটাকে নিজের সৃষ্টিশীলতা বজায় রেখে মনোযোগ দিতে পারেন। তবে এর মানে এই নয় যে, মেসি পরিশ্রম করেন না।
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের পর কোচ স্কালোনি বলেন, “বলের দখল হারিয়ে যখন দল কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল, তখনও ওর দায়বদ্ধতা স্পষ্ট দেখা গিয়েছে। ও মাঠের সর্বত্র ছিল, বল কেড়ে নিচ্ছিল এবং দলের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে”। সত্যিই এ দিন মেসি ছিলেন সর্বত্র, খেলেছেন সারা মাঠ জুড়ে। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন একই রকম সচল, সর্বত্র।
বিশ্বকাপে টানা ছটি ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন মেসি। এই তালিকায় তিনি ব্রাজিলের জরজিনহো ও ফ্রান্সের জা ফঁতের মতো কিংবদন্তিদের পাশে জায়গা করে নিয়েছেন। ২০২২-এর বিশ্বকাপ জিতে নিজের কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘুচিয়েছিলেন মেসি।
অনেকের ধারণা ছিল, এর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর আগের মেসিকে দেখা যাবে না।
মাঠে তাঁর প্রভাব ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে যেন নতুন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছেন বিশ্বফুটবলের রাজপুত্র। প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোল— আর্জেন্টিনার প্রথম দুই ম্যাচে দলের পাঁচ গোলই এসেছে তাঁর পা থেকে। এ এক অন্য মেসি, এক অনন্য মেসি।
সারা দুনিয়া যাঁকে নিয়ে ধন্য ধন্য করছে, বিশ্বের প্রায় সমস্ত ফুটবলপ্রেমীর মুখে যেখানে শুধুই লিওনেল মেসির নাম, সেখানে তিনি নিজে নিজের সম্পর্কে একটাও কথা বলেননি। ম্যাচের পর মিক্সড জোনে যখন সাংবাদিকরা তাঁর কাছে জানতে চান, এই মহাকীর্তির পর কী বলতে চান, তখন মেসির মুখে শুধুই দলের কথা।
কী বললেন মহানায়ক? বলেন, “সত্যি বলতে, এই জয়ে আমি ভীষণ খুশি। বিশেষ করে এটা এত গুরুত্বপূর্ণ একটা জয়, যা কঠিন লড়াই করে আমরা অর্জন করেছি। এই জয়টা আমাদেরই প্রাপ্য ছিল। আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো অপেক্ষা করছে, এই জয় সেগুলোর জন্য আমাদের অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী থাকতে সাহায্য করবে। এটাই বিশ্বকাপ— ম্যাচটা ছিল দুই দলের মধ্যে সমান লড়াই, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আমরা ছ’পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পেরেছি এবং ইতিমধ্যেই পরের পর্বে যোগ্যতা অর্জন করেছি, এতে আমরা খুবই খুশি।”
এ দিন থিয়াগো আলমাদার বুদ্ধিদীপ্ত ডামির ফলে ফাকুন্দো মেদিনার পাস বক্সে মেসির কাছে পৌঁছায়। সেখান থেকে নিচের কোণ লক্ষ্য করে নিখুঁত শটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক। পরে ইনজুরি টাইমের একেবারে শেষ দিকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে দলের রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিত করেন মেসি।
ডালাস স্টেডিয়ামে মেসির ইতিহাস গড়া প্রথম গোলটি অবশ্য কিছুটা দেরিতে আসে। ম্যাচের শুরুতে তাঁর নেওয়া পেনাল্টি প্রতিহত হয়। প্রাণপণ লড়াই করা অস্ট্রিয়া দলের হয়ে ডেভিড আলাবাও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্লক করে আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখেন। তবে শেষ পর্যন্ত মেসির গতিময় জোড়া গোল শুধু তাঁকে এই বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার আগে পৌঁছে দেয়নি, একই সঙ্গে গতবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ ‘জে’ থেকে শেষ ৩২-এও পৌঁছে দেয়।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে এই দিনটা এমনিতেই স্মরণীয়। ঠিক ৪০ বছর আগে এই দিনেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দিয়েগো মারাদোনা তাঁর সেই কিংবদন্তি বিস্ময় গোলটি করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক দিনেই ডালাসে আর এক স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিলেন মেসি।
মেসি, যেভাবে আলবিসেলেস্তেদের গত নয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচের সাতটিতেই পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন, সেভাবেই আবারও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন নিজের অসাধারণ পারফরম্যান্সে। ফুটবলবিশ্ব এখন একটাই প্রশ্ন তুলছে— এটাই …




