পর্দার কিংবদন্তির প্রয়াণে শোকস্তব্ধ শুধু বলিউড নয়, ভারতীয় ক্রিকেট মহলও। বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন নানা পাটেকর (Nana Patekar)। গোয়ার বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। চিকিৎসকদের দীর্ঘ চেষ্টার পরও বাঁচানো যায়নি। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিরাট কোহলি, শচীন তেন্ডুলকর, যুবরাজ সিংহ, সুরেশ রায়না, অজিঙ্ক রাহানে, শিখর ধওয়ানের মতো ক্রিকেট তারকারা।
নানা পাটেকরের (Nana Patekar) সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্কও ছিল বেশ গভীর। বিশেষ করে বিরাট কোহলির ব্যাটিংয়ের বড় ভক্ত ছিলেন তিনি। অতীতে এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, কোহলি তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেলে তাঁর নাকি খেতেই ইচ্ছে করত না। বলেছিলেন, ‘বিরাট এমন এক ক্রিকেটার, যাঁকে আমি খুব ভালবাসি। ওর প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। বিরাট তাড়াতাড়ি আউট হয়ে গেলে জানি না কেন, আমার আর খেতেই ইচ্ছে করে না’, বলেছিলেন নানা। তাঁর প্রয়াণের পরে সেই পুরনো ভিডিও ফের ভাইরাল হয়েছে।
নানা পাটেকরের (Nana Patekar) প্রয়াণের খবর পেয়ে সমাজমাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান বিরাট কোহলি। ভারতীয় কিংবদন্তি ব্যাটার লেখেন, ‘ভারতীয় সিনেমার সত্যিকারের এক কিংবদন্তি। তাঁর কাজ এবং তাঁর উত্তরাধিকার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকবে। নানা পাটেকরজি, শান্তিতে থাকুন। ওম শান্তি’।
A true legend of Indian cinema. His work and legacy will live on for generations. Rest in peace, Nana Patekar ji. Om Shanti. 🙏
— Virat Kohli (@imVkohli) October 8, 2026
কোহলির সঙ্গে নানা পাটেকরের সেই পুরনো সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই তাঁর বার্তাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্রিকেটারকে যেমন নানা ভালবাসতেন, তেমনই ভারতীয় সিনেমায় তাঁর অভিনয়ও কয়েক প্রজন্মের দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল।
শচীন তেন্ডুলকরও স্মৃতিচারণায় তুলে ধরেছেন নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ দিক। সচিন লিখেছেন, ‘আমি নানা পাটেকরকে খুব সোজাসাপ্টা এবং মাটির কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ হিসাবেই মনে করি। তাঁর কাজের মধ্যেও সেই একই সততা ছিল। মারাঠি হোক বা হিন্দি— যে চরিত্রেই অভিনয় করেছেন, তার মধ্যে বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে খুবই দুঃখিত। তাঁর পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি সমবেদনা জানাই। ওম শান্তি’।
I remember Nana Patekar as a very straightforward and grounded person. His work had that same honesty to it. Whether it was in Marathi or Hindi, he always brought something very real to the characters he played. Very sad to hear about his passing. My condolences to his family and loved ones. Om Shanti.
— Sachin Tendulkar (@sachin_rt) October 8, 2026
প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার সুরেশ রায়নার কথায়, ‘এক জন সত্যিকারের কিংবদন্তির প্রয়াণের সঙ্গে একটি যুগেরও অবসান হল। নানা পাটেকরজি— আপনার শক্তিশালী অভিনয়, সততা এবং সরলতা আপনাকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় শিল্পী করে তুলেছিল। আপনাকে চিরকাল মনে রাখব’।
যুবরাজ সিংয়ের স্মৃতিতেও নানা পাটেকরের অভিনয় এবং কণ্ঠ বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘সিনেমা এক সত্যিকারের কিংবদন্তিকে হারাল। আমাদের দেখা সেরা অভিনেতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি। তাঁর এত ছবি দেখেছি, তাঁর কণ্ঠ, পর্দায় উপস্থিতি এবং অসাধারণ অভিনয়ে বার বার মুগ্ধ হয়েছি। তাঁর পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা রইল’।
অজিঙ্ক রাহানে লিখেছেন, ‘নানা পাটেকরজি সত্যিই অসাধারণ এক অভিনেতা ছিলেন। তাঁর কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আনন্দ দিয়েছে। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে খুবই দুঃখিত। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি’।
শিখর ধওয়ানের কথায়, ‘ভারতীয় সিনেমা আজ সত্যিই এক বিশেষ প্রতিভাকে হারাল। নানা পাটেকর সাহেব, আপনার কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবে’।
নানা পাটেকরের জীবন শুধু সিনেমায় আটকে ছিল না। খেলাধুলাতেও আগ্রহী ছিলেন তিনি। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলেছেন, মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে অফস্পিনও করতেন। পরে রাইফেল শুটিংয়ে এমনই মন দেন যে জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় পদকও জেতেন।
ক্রিকেটের প্রতি তাঁর টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে কোনও দিন প্রথাগত কোচিং নেওয়ার সুযোগ হয়নি। তাতে অবশ্য ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা কমেনি। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছিল। ভারতীয় ক্রিকেটারদের মধ্যেও তাঁর পছন্দের তালিকায় ছিলেন বিরাট কোহলি।
আরও পড়ুন: নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ মোদীর, শোকস্তব্ধ বলিউড অভিনেতারা
কোহলির ব্যাটিংয়ের সঙ্গে নানা এতটাই জড়িয়ে পড়েছিলেন যে প্রিয় ব্যাটারের খারাপ দিনে তাঁর নিজেরও মন খারাপ হয়ে যেত। এক বার জানিয়েছিলেন, কোহলি দ্রুত আউট হয়ে গেলে তাঁর নাকি খাওয়ার ইচ্ছাটাই চলে যেত! ক্রিকেটের প্রতি অভিনেতার আবেগ কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
তবে ক্রিকেটের পর জীবনে আরও একটি খেলার সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়েন নানা— তা হল শুটিং। নিছক শখ হিসাবে শুরু করলেও ধীরে ধীরে তা গুরুত্ব দিয়ে চর্চা করতে থাকেন। জাতীয় পর্যায়ের শুটিংয়ে অংশ নিয়ে ‘রেনোনড শট’ সম্মানও পেয়েছিলেন। প্রি-ন্যাশনালসে রুপোর পদকও জিতেছিলেন তিনি।
শুটিং তাঁর কাছে শুধু নিজের নেশা ছিল না, অন্যদের পাশে দাঁড়ানোরও মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় রাইফেল শুটারদের প্রশিক্ষণের খরচ, গুলি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন নানা। পুনের বালেওয়াড়ি শুটিং রেঞ্জেও নিয়মিত যেতেন। সেখানে তরুণ শুটারদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের উৎসাহ দিতেন।
তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং পদ্মশ্রী-সহ একাধিক সম্মানে সম্মানিত নানা পাটেকরের (Nana Patekar) প্রয়াণে তাই শুধু বলিউড নয়, ভারতীয় খেলাধুলারও একটি অধ্যায়ের অবসান হল। অভিনয়ের পাশাপাশি খেলাধুলোর প্রতি এমন গভীর টান— নানা পাটেকরের জীবনের এই দিকটিও হয়তো তাঁর ভক্তদের মনে তাঁকে আরও আলাদা করে বাঁচিয়ে রাখবে।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে হিন্দি সিনেমায় পথচলা শুরু। ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘অঙ্গার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পান’-এর মতো ছবিতে নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখে গিয়েছেন তিনি। ‘পরিন্দা’-য় আন্না চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলেন। ২০১৩ সালে পান পদ্মশ্রী।
তাই নানা পাটেকরের (Nana Patekar) প্রয়াণে শুধু বলিউড বা মারাঠি সিনেমা নয়, শোকাহত ক্রীড়ামহলও। বিরাট-শচীনদের শ্রদ্ধায় স্পষ্ট— পর্দার বাইরেও নানা পাটেকর ছিলেন সিনেমার বাইরেও বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ‘কিংবদন্তি’।
দেখুন:




