• facebook
  • twitter
Monday, 20 April, 2026

মাঠের লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে বাঁশির ভুল

ধারাবাহিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া রেফারিদের ভবিষ্যতের ম্যাচগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার বা অগ্রাধিকার না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

রনজিৎ দাস

ইন্ডিয়ান সুপার লিগ যখন তার ২০২৫-২৬ মরসুমের অন্তিম লগ্নে পৌঁছানোর পথে, তখন মাঠের ফুটবল নৈপুণ্যের চেয়ে বেশি চর্চিত হচ্ছে রেফারিদের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে রেফারির একাধিক খালি চোখে ধরা পড়া ভুলগুলো কেবল ম্যাচের ফলাফল বদলে দিচ্ছে না, বরং ভারতীয় ফুটবলের পেশাদারিত্ব নিয়ে ও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

Advertisement

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের ম্যাচগুলোতে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্লাবগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে ইস্টবেঙ্গল বনাম বেঙ্গালুরু এফসি (১৬ এপ্রিল, ২০২৬)–এই রুদ্ধশ্বাস ৩-৩ ড্র ম্যাচে মূল আলোচনার বিষয় ছিল পুদুচেরির রেফারি অশ্বিনের ভূমিকা। তিনি সারা ম্যাচে ১০টি কার্ড দেখিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪-২৫ মরসুমেও তিনি সর্বোচ্চ ৬৯টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন, যা তাঁর অতিরিক্ত কার্ড ব্যবহারের প্রবণতাকে ফুটিয়ে তোলে।

Advertisement

ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে, বেঙ্গালুরু এফসি-র ব্রায়ান সাঞ্চেজের লাল কার্ডটি ম্যাচের আগে বাতিল করা হয়েছে। কোচের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত পেশাদার ফুটবলে অগ্রহণযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএসএল-এ রেফারির মান খারাপ হওয়ার পেছনে কিছু গভীর কারণ রয়েছে। ইউরোপীয় লিগের তুলনায় ভারতীয় রেফারিরা উচ্চ-চাপের ম্যাচ পরিচালনার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা পান না, যার ফলে দ্রুতগতির খেলায় তারা প্রায়ই ভুল সিদ্ধান্ত নেন।

রেফারির নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে মাঠে ‘ভায়োলেন্ট প্লে’ বা সহিংস আচরণ বাড়ছে। যথাযথ শাস্তি না হওয়ায় খেলোয়াড়দের কেরিয়ার হুমকির মুখে পড়ছে।

নানা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, রেফারিদের পারফরম্যান্সের মানোন্নয়নে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি আইএসএল-এ বিদেশি কোচ এবং ফুটবলারদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও, রেফারিদের বেতন কাঠামো এখনও পিছিয়ে। রেফারিদের যদি পূর্ণকালীন পেশাদার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আকর্ষণীয় বেতন প্রদান করা হয়, তবেই তারা অন্য পেশার চিন্তা ছেড়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ ফুটবলে দিতে পারবেন।

সফলভাবে ম্যাচ পরিচালনার জন্য বিশেষ ইনসেনটিভের ব্যবস্থা করলে রেফারিদের মধ্যে নিখুঁত হওয়ার তাগিদ বাড়বে।

কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং তার সঠিক ও নিপুণ প্রয়োগই পারে বিতর্ক কমাতে। ভারত বর্তমানে ভিএআর লাইট চালুর পরিকল্পনা করলেও, সমালোচকদের মতে কেবল প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। যদি মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা উন্নত না হয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারেও ভুল থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রেফারিদের মাঠের পজিশনিং এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি যাচাই করতে আধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহারের প্রয়োজন। এর মাধ্যমে রেফারিদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে তাদের আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।

এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে রেফারিদের ভুলের জন্য তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন। যেমন, প্রতিটি ম্যাচের ‘কি ম্যাচ ইনসিডেন্ট’ বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এখন এএফসি (AFC) অ্যাসেসরদের দ্বারা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ধারাবাহিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া রেফারিদের ভবিষ্যতের ম্যাচগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার বা অগ্রাধিকার না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারতীয় ফুটবলের বাণিজ্যিক সাফল্যের সমান্তরালে যদি মাঠের বিচারের মান উন্নত না হয়, তবে লিগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০২৫-২৬ মরসুমের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে রেফারিদের বেতন বৃদ্ধি, নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটানো অপরিহার্য। মাঠের লড়াই যেন বাঁশির ভুলে ম্লান না হয়, সেটাই এখন ফুটবল প্রেমীদের প্রত্যাশা।

Advertisement