প্রশ্ন : সন্তোষ ট্রফির প্রাথমিক পর্বে আপনার দল কেমন খেললো?
যশবন্ত : জম্মু ও কাশ্মীরকে হারিয়ে গ্রুপ থেকে ফাইনাল রাউন্ডে খেলার সুযোগ হয়েছে। গত মরশুমে এই জম্মু ও কাশ্মীরের কাছে হেরেই প্রাথমিক পর্ব থেকে আমাদের ছিটকে যেতে হয়েছে। তাই সর্তক থেকে এবার খেলতে হয়েছে। ওদের দলে আইলিগে খেলা প্লেয়ার ছিল। দলের কোচ ইসফাক আহমেদ ভারতীয় দলের কোচিং করিয়েছেন। তাই ওদের দলের বিরুদ্ধে খেলায় ছেলেদের আলাদা অনুভূতি কাজ করেছে। ছেলেদের মোটিভেশন করতে সুবিধা হয়েছে।
প্রশ্ন : গত মরশুমের সন্তোষ ট্রফির প্রাথমিক রাউন্ডে আপনাদের পারফরম্যান্স ভালো হলো না। গতবারের ব্যর্থতায় কোন বিষয়ে এবার সর্তক থেকেছিলেন?
যশবন্ত : এক একজন কোচের এক একরকম দর্শন থাকে। তার ভিত্তিতে দল হয়। দল কখনো ভালো ফল করে। আবার খারাপ ফলও হতেই পারে। গ্রুপের মাত্র তিনটে ম্যাচ। একটা ম্যাচ খারাপ হয়ে গেলে তার ভয়ানক খেসারত দিতে হয়। তবে, এই গ্রুপ বিন্যাসের বদল ঘটিয়ে রাজ্যভিত্তিক র্যাঙ্কিং পদ্ধতি অবলম্বন করেই, গ্রুপ বিন্যাসে কিভাবে খেলার সংখ্যা বাড়ানো যায়, ভাবনা-চিন্তা করা উচিত। দেশের সেরা রাজ্য দলগুলো একটা বা দুটো ম্যাচ খেলে প্রাথমিক পর্ব থেকে ছিটকে গেলেন, ফাইনাল রাউন্ডের খেলায় মান তবে কখনোই ভালো হতে পারে না। গতবার আমরা প্রাথমিক পর্ব থেকে ছিটকে গিয়েছিলাম। এবার জম্মু ও কাশ্মীর দল প্রাথমিক পর্ব থেকে ছিটকে গেল। এছাড়া মণিপুর, মিজোরাম, গোয়া, কর্নাটকের মতো দলগুলো প্রাথমিক রাউন্ড থেকেই এবার ছিটকে গেল। তাই ফেডারেশনকে এই গ্রুপবিন্যাস নিয়ে ভাবা উচিত।
Advertisement
প্রশ্ন : এই মরসুমের সন্তোষ ট্রফির টিম গত মরসুমের তুলনায় কতটা শক্তিশালী?
যশবন্ত: এভাবে এক মরসুমের দলের সঙ্গে আরেক মরসুমের দলের তুলনা চলে না। তবে আমাদের এবার যথেষ্ট শক্তিশালী দল। ৪৫ জনের প্রাথমিক ট্রায়াল প্রক্রিয়া থেকে ধাপে ধাপে ২০ জনের দল গড়তে গিয়ে খুব অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। অনেক ভালো ভালো ফুটবলার ট্রায়ালে এসেছিল। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবলার। গোলকিপার পজিশনে এমন তিনজন ছিল— আমাদের তাদের মধ্যে থেকে দু’জনকে বেছে নিতে অসুবিধায় পড়তে হয়েছে। করণদীপ সিং রেল দলের ট্রায়াল থেকে বাদ পড়ে আমাদের ট্রায়ালে এসেছে। ট্রায়াল থেকেই মূল দলে সে এসেছে। হিমাংশু জাংরা পরিচিত নাম। তবে, আকাশমনদীপ, অভিষেক রাটু, হরমনদীপ, আকাশদীপ— প্রত্যেকেই প্রাথমিক পর্বে ভালো ফুটবল উপহার দিয়েছে। এরাই ফাইনাল রাউন্ডে ভালো দলের বিরুদ্ধে, আরো ভালো ফুটবল খেলবে। পাঞ্জাব লিগে সেরা কোচের সম্মান যেমন আমি পেয়েছি, তেমনি রক্ষণের আকাশমনদীপ সেরা ডিফেন্ডারের পুরস্কার পেয়েছে। প্রাথমিক পর্বে আকাশমনদীপ খুব ভালো খেলেছে। এদের সবার উপর আমার ভরসা আছে, ওরা ফাইনাল রাউন্ডে আরো ভালো খেলবে।
Advertisement
প্রশ্ন : হিমাংশু জাংরা গ্রুপ পর্যায়ে আপনার টিমে প্রতি ম্যাচেই গোল করেছে। এই মুহূর্তে তার আরো বড় পর্যায়ে খেলা উচিত ছিল না কি?
যশবন্ত : আমার বাবা তো ৭০-৮০-র দশকের অনেক বড় ফুটবলার ছিলেন। ১৭ বার সন্তোষ ট্রফি খেলেছেন। সন্তোষ ট্রফিতেই ভালো খেলে নজর কাড়ার সুযোগ সবসময় থাকে। আমাদের রাজ্যে ‘ক্লাব টিম’ থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় টিম অনেক বেশি আছে। ফলে, রাজ্য দলে যখন খেলার সুযোগ পেয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে পারছে। প্রাথমিক পর্বের পারফরম্যান্স ওকে ধরে রাখতে হবে। প্রাথমিক পর্বে ৫টা গোল করে গোলদাতার শীর্ষে আছে। এই গোল ফাইনাল রাউন্ডের খেলায় ওর আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। নিশ্চয়ই হিমাংশু আরো বড় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবে।
প্রশ্ন : আপনাদের সময়ের সন্তোষ ট্রফি ও বর্তমান সন্তোষ ট্রফির মধ্যে গুণগত পরিবর্তনকে কীভাবে দেখছেন?
যশবন্ত: সন্তোষ ট্রফি আগে দেশের প্রথমসারির রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্ট ছিল। দেশের সেরা ফুটবলারদের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য প্রান্তের প্রতিভাবান ফুটবলাররা এখানে খেলতো। ফলে ভালো ভালো ফুটবলারদের বিরুদ্ধে প্রতিভাবান ফুটবলাররা তাদের সেরাটা দিয়ে সকলের নজর কাড়ার চেষ্টা করতেন। আইএসএল ও আইলিগের ডামাডোলে প্রাথমিক পর্বে ঐসব লিগের কিছু ফুটবলারদের এবার খেলতে দেখা গেছে। ফাইনাল রাউন্ডের প্রতিযোগিতায় তাদের দেখা যাবে কিনা জানা নেই। তারা থাকলে প্রতিযোগিতার মান বাড়বে। প্রতি ম্যাচে ভালো লড়াই হবে। আমরাও ভালো দল গড়েই ফাইনাল রাউন্ডে খেলতে যাবো।
প্রশ্ন : এখনকার ফুটবলারদের জন্য, আপনার অভিজ্ঞতায় কোন বিষয়ে জোর দিতে বলছেন?
যশবন্ত: দীপেন্দু বিশ্বাস, দীপঙ্কর রায়, দীপক মণ্ডল, লোলেন্দ্র ও রেনেডি সিং—আমরা অনূর্ধ-২১ ভারতীয় দলে একসঙ্গে ছিলাম। এখনকার মতো এত পেশাদারিত্বের কথা তখন হত না। পেশাদারিত্বের মানে তবে কী? আইএসএল ও আইলিগে ভালো টাকায় সই করতে পারলেই সব শেষ হয়ে যায় না। টিমে নিয়মিত খেলতে হবে। পাঞ্জাব, কেরল, বাংলার ফুটবলারদের জিনে ফুটবল আছে। রক্তে ফুটবল মিশে আছে। ছেলেদের অভিভাবকরা ২/৩বছর ফুটবল খেলার পরেই পড়াশুনোয় মন দিতে বলছেন। এদিকে সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ খুব কম। সুযোগ কিছুটা হলেও খেলোয়াড়দের চাকরি কোটা অনেক কম। একসময় বিএসএফ ভারতীয় ফুটবলে সাড়াজাগানো ফুটবল দল ছিল। ওখানে ফুটবলারদের চাকরির সুযোগও ছিল। এখন সারা দেশে ফুটবল ছড়িয়ে পড়েছে। জাতীয় লিগ চালু হওয়ার পর আমি জেসিটির হয়ে যেমন খেলেছি, আবার গোয়ার চার্চিল ব্রার্দাস ও স্পোর্টিং গোয়াতে খেলেছি। ছেলেদের সামনে এই সুযোগ এখন আরো বেড়েছে। আইএসএল হচ্ছে। টাকার দিকে নজর থাকলে চলবে না। ফুটবলকে ভালোবাসতে হবে। নিজের মধ্যে প্রতিনিয়ত শেখার খিদে আনতে হবে। লক্ষ্য ঠিক করে এগোতে হবে। আর, শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। কঠিন লড়াই, ভয়হীন কঠিন লড়াই এবং আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে।
প্রশ্ন: ভারতীয় ফুটবলের বর্তমান ডামাডোলে দেশের ফুটবল কতটা পিছিয়ে পড়ছে?
যশবন্ত: এখন ফুটবল সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক খেলা হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত কোচিংয়ের বিভিন্ন ধারায় পরিবর্তন হচ্ছে। তার সঙ্গে আপডেট থাকতে হচ্ছে। খেলার মাঠ থেকে একজন ফুটবলারের ফিটনেস— যে পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে হয়ে চলেছে। তার নিরিখে আমরা কতটা পিছিয়ে পড়ছি, নানা পরিপ্রেক্ষিতে তার আলোচনা আছে। আমাদের ছেলেরা কীভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে— এটাই লক্ষ্য করার বিষয়।
আমাদের রাজ্যে গ্রামের ফুটবলে দারুণ পরম্পরা আছে। গ্রামের প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার কিংবা অন্য পেশার ব্যক্তিরা যাঁরা বিদেশে থাকেন, ফুটবল খেলার জন্য, গ্রামের কোচিং ক্যাম্পে তাঁরা খেলার বিভিন্ন সরঞ্জাম পাঠান। আধুনিক প্রযুক্তিকে, এভাবে ব্যবহারের সুযোগ আগে এতটা ছিল না। এবার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে যে অগ্রগতি ও দেশের লিগ কাঠামো—ফুটবলারদের ম্যাচ টাইমের মধ্যে থাকতে হবে। আমাদের টার্গেট ঠিক করা চাই। ইয়ুথ লিগের অনেক খেলা বেড়েছে। কিন্তু ফেডারেশনের সারা বছরের একটা নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার দিতে হবে। এমন ক্যালেন্ডার, যেখানে ছেলেদের প্রচুর খেলার সুযোগ থাকবে এবং এই খেলাগুলোর ধারাবাহিক প্রচার চাই। টিভিতে এইসব ছেলেদের খেলা দেখাতে হবে। যেসব রাজ্যে ফুটবলের চল ও তার ভিত্তি আছে— সেইসব রাজ্যে ফেডারেশনের একাধিক অ্যাকাডেমি চালু করতে হবে। ক্লাব ও ফেডারেশনের লক্ষ্য ও প্রচেষ্টায় সমতা থাকতে হবে। ক্রিকেটের এত ভালো বাণিজ্যিকীকরণ হতে পারে, ফুটবলে ডামাডোল হবে কেন? পারস্পরিক মেলবন্ধন ঠিক থাকলে, এবছর যতটা পিছিয়ে পড়েছে— আবার এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফুটবলের চল বেড়েছে। পাঞ্জাব, বাংলা, কেরল মহারাষ্ট্র ছাড়াও উত্তরপূর্বের অনেক রাজ্যে ফুটবল এগিয়ে গিয়েছে। আমরা যারা এগিয়ে ছিলাম, আমাদের পিছিয়ে পড়ায় ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আরো বিশদ আলোচনা দরকার। প্রাথমিকভাবে জাপান বা এশিয়ার উন্নত কোনো দেশের মডেলকে টার্গেট করে এগোলে ভালো হয়।
Advertisement



