ব্রিসবেন থেকে আজ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় এসে নামছেন ব্রাজিলের ফুটবলাররা। সঙ্গে তাদের কোচ কার্লো আনসেলোত্তি ও কোচিং স্টাফ এবং অন্যান্য সাপোর্ট স্টাফ— সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ জনের দল একটি চার্টার্ড বিমানে করে প্রায় ৮,৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সন্ধ্যায় কলকাতার মাটি ছোঁবেন এবং তারপরই ব্রাজিল-ম্যানিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে কলকাতা।
বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকার সময় ব্রাজিলের সমর্থনে গলা ফাটায় সারা বাংলা। এ বার সেই প্রিয় ব্রাজিলের সেরা তারকাদের দেখার সুযোগ ভক্তদের সামনে। শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের গ্যালারির হাল দেখলেই বোঝা যাবে সত্যিই ব্রাজিলের জন্য কতটা আন্তরিক কলকাতা তথা বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা।
ব্রাজিল দল থেকে চোটের কারণে ছিটকে গিয়েছেন তাদের সবচেয়ে ভাল ফর্মে থাকা ফরোয়ার্ড রাফিনহা। তাই তাঁকে ব্রিসবেন থেকেই ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর ক্লাবের শহর বার্সেলোনায়, যে ক্লাবের তিনি অধিনায়ক। অসাধারণ ফর্মে ছিলেন রাফিনহা। অস্ট্রেলিয়ায় দুই ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। কিন্তু কলকাতার ম্যাচে সেই রাফিনহাকে দেখার সুযোগ হবে না।
রাফিনহার অনুপস্থিতিতে তাই পুরো ফোকাস গিয়ে যে পড়বে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের (Vinicius Jr) উপর, এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্বকাপেই ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) সবার নজর কেড়ে নেন এবং ভারতে তাঁর জনপ্রিয়তা দশগুন বেড়ে গিয়েছে বিশ্বকাপের পর থেকেই। ব্রাজিল কলকাতায় আসছে শুনে ফুটবল-ভক্তদের প্রথম প্রশ্নই ছিল ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) আসবেন তো?
সেই ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) কলকাতায় এসে পড়ছেন আজই, সন্ধ্যায়। ব্রাজিলের এই সফর নিয়ে ক্রমশ তেতে উঠছে কলকাতা। হয়তো টিকিটের চড়া দামের জন্য মাঠে গিয়ে তাঁকে দেখার সাধ অনেকের অপূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু কলকাতায় এসে তিনি কী করবেন, কেমন খেলবেন, তা জানার আগ্রহ রয়েছে ষোলো আনা।
ফের ভারতে ভিনিসিয়াস, প্রথম কবে এসেছিলেন?
তবে অনেকেরই হয়তো জানা নেই, ভিনিসিয়াস কিন্তু এই প্রথম ভারতে আসছেন না। এর আগেও তিনি এ দেশে এসে খেলে গিয়েছেন। তাই এই সফর তাঁর (Vinicius Jr) দ্বিতীয় ভারত সফর।
তখনও রিয়াল মাদ্রিদের তারকা হয়ে ওঠেননি ভিনিসিয়াস জুনিয়র(Vinicius Jr) । ফ্লামেঙ্গোর যুব অ্যাকাডেমির সেই কিশোর প্রতিভাই খেলতে এসেছিলেন ভারতে। সময়টা ২০১৬। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৬।
দশ বছর পরে সেই ভিনিসিয়াসই(Vinicius Jr) এখন ব্রাজিলের অন্যতম বড় তারকা। আর শনিবার যুবভারতীতে ভারতের বিরুদ্ধে ভিনির (Vinicius Jr) মাঠে নামার আগে ফিরে আসছে সেই পুরনো স্মৃতি— এ দেশে প্রথম বার খেলতে এসে গোলও করেছিলেন তিনি।
এ বার অবশ্য মঞ্চটা সম্পূর্ণ আলাদা। এ বার আর কোনো বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা নয়, কলকাতায় সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফিফা ফ্রেন্ডলি। ভারতের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের সিনিয়র দলের এটাই প্রথম ম্যাচ। ফলে ভিনিসিয়াসের কাছেও নিশ্চয়ই এই সফরের গুরুত্ব আলাদা।
ফিরে যাওয়া যাক ২০১৬-য়। সে বছর গোয়ায় হয়েছিল প্রথম ব্রিকস অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল কাপ। সেই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের হয়ে খেলেছিলেন ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) । ভারত, চিন, রাশিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে খেলেছিল ব্রাজিল। চারটি ম্যাচেই জিতেছিল তারা, শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নও হয়েছিল। ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) করেছিলেন চার-চারটি গোল। তার মধ্যে একটি ছিল ভারতের বিরুদ্ধেও।
তবে ভারতের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ কিন্তু ব্রাজিলের কাছে একেবারেই সহজ ছিল না। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই ব্রেনার গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেন। কিন্তু ১৯ মিনিটে ভারতকে সমতায় ফেরান কোমল থাটাল। বক্সের বাইরে থেকে তাঁর বাঁকানো শটে বল জালে জড়িয়ে যায়। সেটিই ছিল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে কোনও ভারতীয় ফুটবলারের প্রথম গোল।
তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতে নেয় ব্রাজিল। ৩০ মিনিটে স্যান্টোস গোল করে ব্যবধান বাড়ান। আর খেলা শেষ হওয়ার মাত্র আট মিনিট আগে গোল করেন ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) । ভারতকে ৩-১ হারিয়ে ম্যাচ জেতে ব্রাজিল। সেই টুর্নামেন্টে সেটিই ছিল ব্রাজিলের প্রথম গোল খাওয়া।
ফাইনালেও গোল করেছিলেন ভিনিসিয়াস। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫-১ হারিয়ে ট্রফি জেতে ব্রাজিল। চার গোল করে প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠেন সেই কিশোর।
ভারত থেকে ফিরেই ‘বিশাল উপহার’
ভারতে খেলে যাওয়ার পরের বছরই তাঁর জীবনে আসে বড় টার্নিং পয়েন্ট— ৪৬ মিলিয়ন ইউরোয় রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন ভিনি।দশ বছর পরে সেই কিশোর এখন বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার।
আর ভারতীয় ফুটবল যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। সেই ২০১৬-র পরেও ব্রাজিলের সিনিয়র দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ আসেনি ভারতের। তাই শনিবারের ম্যাচটি শুধু ভারতের কাছে স্প্যেশ্যাল নয়, ভিনিসিয়াসের সেই ভারত-সফরের স্মৃতিকেও ফিরিয়ে আনতে পারে।
তখন তিনি ছিলেন ফ্লামেঙ্গো অ্যাকাডেমির ১৬ বছরের প্রতিভা। এ বার তিনি আসছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা, সেলিসাওদের অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান অস্ত্র হয়ে। তবে কলকাতায় আসার আগে ভিনিসিয়াসের ফর্ম খুব একটা ভাল নেই। বিশ্বকাপে যে ফর্মে দেখা গিয়েছিল তাঁকে, সেই ফর্মে তিনি নেই। তাঁর আত্মবিশ্বাস ফেরাতে তাই তাঁকে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচে পেনাল্টি মারতে দেন তাঁর সতীর্থরা।
Lo asustado que estaba Vini antes de patear el penal
SE CONFIRMA LA TEORIA pic.twitter.com/epquo0CBid
— Nacho Futbol (@NachoFutbol23) September 29, 2026
আত্মবিশ্বাস ফেরাতে পেনাল্টি
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গোল করার দায়িত্ব এসে পড়েছিল ভিনিসিয়াস জুনিয়রের কাঁধেই। আর তার নেপথ্যে ছিলেন সতীর্থ ব্রুনো গিমারায়েস। ভিনিসিয়াসের আত্মবিশ্বাস ফেরাতে শেষ মুহূর্তের পেনাল্টি তাঁকে নিতে দেন আর্সেনালের মিডফিল্ডার। ম্যাচের পর সেই ঘটনার কারণ নিজেই জানিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকা।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৪-২ জয়ের ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে শেষ গোলটি করেন ভিনিসিয়াস। ৮০ মিনিটে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। মাঠে ছিলেন ব্রুনোও। রাফিনহা না থাকলে জাতীয় দলের পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব সাধারণত ব্রুনোরই। ফলে তিনিই এগিয়ে আসবেন— এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এ বার অন্য ছবি দেখা যায়। ব্রুনো ভিনিসিয়াসকে পাঠান পেনাল্টি নিতে।
কেন? ম্যাচের পর ভিনিসিয়াস (Vinicius Jr) সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘রাফিনহা না খেললে ব্রুনোই আমাদের পেনাল্টি নেয়। তাই ভেবেছিলাম, ও-ই হয়তো পেনাল্টিটা নিতে চাইবে। কিন্তু ও জানে, এই মুহূর্তে আমার একটু আত্মবিশ্বাস দরকার। তাই আমাকেই বলে পেনাল্টিটা নিতে। এ জন্য ব্রুনোকে ধন্যবাদ’। এই ম্যাচটিই ব্রাজিলের হয়ে ব্রুনোর ৫০তম ম্যাচ ছিল। এমন এক মাইলফলকের ম্যাচে বড় মনেরও পরিচয় দেন তিনি।
শুধু একটি গোল নয়, ভিনিসিয়াসের কাছে ওই পেনাল্টির গুরুত্ব ছিল আরও বেশি। বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর তাঁর নিজেরও সময়টা খুব একটা ভাল যাচ্ছিল না। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে মরসুমের শুরুতেও গোলের খরা চলছিল। সেই পরিস্থিতিতে জাতীয় দলের হয়ে গোল করাটা তাঁকে মানসিক ভাবে স্বস্তি দিয়েছে বলেই মনে করছেন ভিনিসিয়াস।
‘এই মুহূর্তে আমার আত্মবিশ্বাস দরকার’
তিনি বলেন, ‘আমার সতীর্থেরা জানে, এই মুহূর্তে আমার একটু আত্মবিশ্বাস দরকার। বিশ্বকাপ হার মেনে নেওয়া খুব কঠিন। সেই ধাক্কা থেকে ফিরে আসাটাও সহজ নয়’।
ব্রুনোও পরিষ্কার করে দিয়েছেন, এর মধ্যে কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থ ছিল না। বরং ব্রাজিল দলের স্বার্থেই তিনি ভিনিসিয়াসকে সুযোগ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘ভিনির আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্যই পেনাল্টিটা ওকে দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় দলে আমাদের মধ্যে কোনও অহংকার নেই। বিশ্বকাপে কোচ আমাকে পেনাল্টি নিতে বলেছিলেন। আজ উনি ভিনিকে বলেছেন। ভিনির সত্যিই একটা গোল দরকার ছিল। ও পেনাল্টিটা খুব ভাল নিয়েছে’।
ব্রুনোর বক্তব্য, ‘আমরা ব্রাজিলের জন্য যা ভাল, সেটাই চাই। ভিনির গোল করার জন্য আমরা খুশি। এখন শুধু ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে’।
ভিনির আত্মবিশ্বাস ফেরানোর এই উদ্যোগের পিছনে কোচ কার্লো আনসেলোত্তিরও ভূমিকা ছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি জানান, রাফিনহা প্রথম পেনাল্টিটি নেওয়ার পর মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। ব্রুনো ইতিমধ্যেই একটি গোল করেছিলেন। তাই দ্বিতীয় পেনাল্টিটি ভিনিসিয়াসের নেওয়াই উচিত বলে মনে হয়েছিল তাঁর।
এ বার সেই ভিনিসিয়াসই আসছেন কলকাতায়। শনিবার যুবভারতীতে ভারতের বিরুদ্ধে ব্রাজিলের ম্যাচে তাঁর দিকেই থাকবে ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের নজর। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাওয়া সেই গোল ভিনির আত্মবিশ্বাস কতটা বাড়িয়েছে, যুবভারতীর মাঠে তা-ই প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন তিনি।
দেখুন: সামনেই ভারত-ব্রাজিল মহারণের জন্য নতুন রূপে সেজে উঠেছে যুবভারতী, কোথায় কী বদল?




