• facebook
  • twitter
  • youtube
Wednesday, 7 October, 2026

মেসির শেষ ম্যাচ, আবেগে ভাসল বুয়েনস আইরেস, শেষ ম্যাচেও গোল-অ্যাসিস্ট, বিদায়ী ম্যাচের ধারাবিবরনী

ম্যাচ শুরুর আগেই আবেগঘন পরিবেশ। জাতীয় সঙ্গীতের সময় চোখের জল সামলাতে দেখা যায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে। তিন ছেলেকে পাশে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তিনি। মাঠের মাঝখানে মেলে ধরা হয়েছিল বিশাল ১০ নম্বর জার্সি, লেখা ছিল ‘Gracias’

মেসির শেষ ম্যাচ, আবেগে ভাসল বুয়েনস আইরেস, শেষ ম্যাচেও গোল-অ্যাসিস্ট, বিদায়ী ম্যাচের ধারাবিবরনী

Photo: Representational Image

যে মানুষটির পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস বদলে গিয়েছে, দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচেও সেই লিওনেল মেসি (Lionel Messi) রেখে গেলেন নিজের ছাপ। গোল করলেন, দু’টি গোল করালেন। আর ম্যাচ শেষে চোখের জলে বিদায় জানালেন আর্জেন্টিনাকে। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলেন।

বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল যেন মঙ্গলবার রাতে পরিণত হয়েছিল মেসির  (Lionel Messi) মঞ্চে। ম্যাচ শুরুর আগেই আবেগঘন পরিবেশ। জাতীয় সঙ্গীতের সময় চোখের জল সামলাতে দেখা যায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে। তিন ছেলেকে পাশে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তিনি। মাঠের মাঝখানে মেলে ধরা হয়েছিল বিশাল ১০ নম্বর জার্সি, লেখা ছিল ‘Gracias’।

ম্যাচের ১০ মিনিটে থেমে যায় খেলা। কেন? মেসির (Lionel Messi) ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানাতে। গোটা স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়। আকাশে আতশবাজি। বেনিনের ফুটবলারেরাও এগিয়ে এসে মেসির (Lionel Messi) সঙ্গে হাত মেলান। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন ফুটবল নয়, শুধু এক জন কিংবদন্তির বিদায়ই হয়ে ওঠে প্রধান বিষয়।

প্রথমার্ধ গোলশূন্য। মেসি (Lionel Messi) নিজেও কয়েক বার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বেনিনের গোলরক্ষক তাঁকে আটকে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য আর আটকানো যায়নি আর্জেন্টিনাকে। মেসির (Lionel Messi) পাস থেকেই নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে এগিয়ে দেন দলকে। পরে নিকো পাজ ব্যবধান বাড়ান। আর তার পর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত—পেনাল্টি থেকে গোল করলেন মেসি (Lionel Messi)। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১২৬-এ। শেষ ম্যাচেও গোল এবং দু’টি অ্যাসিস্ট—আর কী-ই বা চাইতে পারতেন মেসি (Lionel Messi)!

‘মনে পড়ছে বাবার কথা’

ম্যাচ শেষে বিদায়ী বক্তৃতায় মেসির (Lionel Messi) গলা ভারী। প্রথমেই বাবার কথা মনে পড়ল তাঁর। বলেন, ‘আজ আমার মনে এত রকমের আবেগ। তবে সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে।’

তার পর জাতীয় দলের জার্সির কথা বলতে গিয়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি মেসি (Lionel Messi)। তাঁর কথায়, ‘এই জার্সিকে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। ২০ বছর ধরে, এমনকী, সবচেয়ে কঠিন সময়গুলিতেও আমি কখনও লড়াই থামাইনি। এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, নিজের সবটুকু দিয়েছি এবং এখানে থাকতে চেয়েছি।’

মেসি (Lionel Messi) আরও বলেন, ‘এখন থেকে এখানে আর আসতে না পারা, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সঙ্গে আর থাকতে না পারাটা আমাকে খুব কষ্ট দেবে। আমার হাতে থাকলে আমি সারা জীবন এখানে থাকতে চাইতাম। কারণ, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর কিছু নেই।’

কথা বলতে বলতে মেসি (Lionel Messi) যেন বিদায়টাকে আরও কিছুটা পিছিয়ে দিতে চাইছিলেন। বললেন, ‘আজ আমি হয়তো অন্য দিনের চেয়ে বেশি কথা বলছি। কারণ আমি চাই না এই মুহূর্তটা শেষ হয়ে যাক।’

আরও পড়ুন: ব্রাজিল-ম্যাচের সেই লড়াই আর দেখা গেল না, উরুগুয়ের কাছে হাফ ডজন গোল খেল ভারত, দিল এক

‘সতীর্থদের সবাইকে ধন্যবাদ’

এর পর মেসি (Lionel Messi) ফিরে যান সেই সব সতীর্থের কাছে, যাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে এসেছিল ২০২২-এর বিশ্বকাপ। বলেন, ‘বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা—সবই আমরা জিতেছি। তার জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই যাত্রা শুধু ২০২২ বা শেষ বিশ্বকাপের নয়। তার অনেক আগে থেকেই আমার সঙ্গে বহু সতীর্থ এই জার্সির জন্য লড়াই করেছে।’

সেই সতীর্থদের নিয়েই মেসির আবেগঘন স্বীকারোক্তি, ‘কখনও সন্দেহ করবেন না, ওরা আর্জেন্টিনার জন্য কতটা লড়েছে, কতটা দিয়েছে। যখনই আমরা মাঠে নামতাম, আমি জানতাম যে যে কোনও দলের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে পারি। আমার পাশে এমন যোদ্ধারা ছিল, যারা মাঠে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিল।’

‘আগামী প্রজন্মকে সমর্থন করব’

শেষে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের উদ্দেশে মেসির বার্তা, ‘তোমাদের সবাইকে আমি ভীষণ মিস করব। তবে সব সময় তোমাদের পাশে থাকব। এই ছেলেদের এবং যারা এর পরে আসবে, সবাইকে আমি সমর্থন করে যাব।’

২০৮ ম্যাচ। ১২৬ গোল। ৬৭ অ্যাসিস্ট। একটি বিশ্বকাপ, দু’টি কোপা আমেরিকা, একটি ফাইনালিসিমা এবং অলিম্পিক্সে সোনা। সংখ্যাগুলি হয়তো মেসির কেরিয়ারের হিসাব দিতে পারে, কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের হৃদয়ে তাঁর জায়গার হিসাব দিতে পারে না।

দেশের জার্সিতে শেষ বার মাঠ ছাড়লেন মেসি। কিন্তু মনুমেন্টালের গ্যালারি থেকে যে গর্জন উঠল, তাতে একটা কথাই পরিষ্কার—মেসি আর্জেন্টিনাকে বিদায় জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা মেসিকে নয়।

আরও পড়ুন: বৃহস্পতিবার আইএফএ শিল্ড ফাইনালে খেলতে পারবেন জাতীয় দলে থাকা দুই প্রধানের খেলোয়াড়রা?

‘সারা বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায়’

মেসির বিদায়ের আগে তাঁকে নিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন তাঁর প্রাক্তন বার্সেলোনা এবং প্যারিস সঁ জরমঁ সতীর্থ নেইমার। ব্রাজিলীয় তারকার সঙ্গে মেসির বন্ধুত্ব ফুটবল মাঠের বাইরেও দীর্ঘ দিনের। ইনস্টাগ্রামে নেইমার লিখেছেন, ‘শুধু আর্জেন্টিনা নয়, ফুটবলের জন্য তুমি যা করেছ, তার জন্য গোটা বিশ্ব তোমাকে ধন্যবাদ জানায়। আমাকে আরও বেশি করে ফুটবলকে ভালবাসতে শেখানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার বিরুদ্ধে খেলতে পারা আমার কাছে গর্বের, আর তোমার সঙ্গে ইতিহাস তৈরি করতে পারা আরও বড় সম্মানের।’

মেসির শেষ ম্যাচের আগে আবেগ সামলাতে পারেননি আর্জেন্টিনার সতীর্থ রদ্রিগো দে পলও। ইন্টার মায়ামিতে মেসির সঙ্গে ক্লাব ফুটবলও খেলেন তিনি। দে পলের কথায়, ‘ও শুধু ফুটবলার হিসাবে আমাকে বড় করেনি, মানুষ হিসাবেও অনেক উন্নত করেছে। ওর জন্য আমি আরও ভাল মানুষ, ভাল বাবা, ভাল বন্ধু এবং ভাল ক্রীড়াবিদ হতে পেরেছি। আমি ওকে বলতে চাই, আমি ওকে ভালবাসি। ও জানে, ও আমার ভাইয়ের মতো। ওর হৃদয়টা বিশাল।’

প্রাক্তন সতীর্থ অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াও মেসির বিদায়ের মুহূর্তে আবেগপ্রবণ। তাঁর কথায়, ‘এমন একটা দিন কেউই আসুক, তা চাইনি। কিন্তু ওকে এত খুশি দেখে, এবং এই শান্তি দেখে যে ও নিজের সবটুকু দিয়ে দিয়েছে—সেটাই আমাদের আনন্দ দেয়। সকলের জন্য দিনটা খুব বিশেষ। মেসি, তোমাকে সারা জীবনের জন্য ধন্যবাদ।’

শুধু সতীর্থ বা ফুটবল তারকারাই নন, মেসির বিদায়ে কেঁদেছেন আর্জেন্টিনার সাধারণ সমর্থকেরাও। ১৯ বছরের হোসে গ্যারাসেদো বললেন, ‘আমি কেঁদেছি, কারণ মেসির শেষ ম্যাচটা মাঠে বসে দেখতে পেরেছি। আবার এটাও ভেবে কষ্ট হচ্ছে যে ও আর এখানে থাকবে না। এই জার্সির জন্য ও লড়াই করেছে, যা যা ওর কাছে চাওয়া হয়েছে, সব দিয়েছে।’

আর এক সমর্থক ইসাইয়াস জেনাসের কাছে মেসি শুধু ফুটবলার নন, কঠিন সময়ের আশ্রয়। তাঁর কথায়, ‘আর্জেন্টিনার মানুষ হিসাবে সাম্প্রতিক যে আনন্দগুলো আমরা পেয়েছি, তার অনেকটাই মেসির জন্য। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যখন খারাপ, মানুষ যখন নানা সমস্যায়, তখন ফুটবলই আমাদের আশ্রয়। এই মুহূর্তে ওকে বিদায় জানাতে আমরা এখানে আসব না—তা কি হয়?’

বিশ্বকাপ এবং দু’টি কোপা আমেরিকা জয়ী মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল শেষ করলেন জাতীয় দলের হয়ে ১২৫ গোল ও ৬৮টি অ্যাসিস্টের নজির নিয়ে। তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে অবশ্য মেসির নিজের বার্তাই ছিল সবচেয়ে ছোট, অথচ সবচেয়ে গভীর—‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি।’

দেখুন: